বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১৩ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের উপস্থিতিতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে জানানোর আশ্বাস দিয়েছেন দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের বিস্তারিত জানিয়েছেন।
সাক্ষাতে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করায় দেশের অর্থনীতি, সমাজ, জনমিতি ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতির সমাধানে চীনের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
জবাবে লিউ হাইশিং জানান, রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে চীন অবগত রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের বিষয়টি তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে তুলে ধরবেন।
বৈঠকের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান লিউ হাইশিং। প্রধানমন্ত্রীও শি জিনপিং ও চীনের প্রিমিয়ার লি ছিয়াংয়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানান।
এ সময় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। লিউ হাইশিং বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নতুন যুগ সূচনার যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘোষণার ভিত্তিতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বস্ত করেন চীনা মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়েও তিনি আস্থা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। দীর্ঘদিনের এই বন্ধুত্ব দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিশেষ স্থান তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া বর্তমান নেতৃত্বের দায়িত্ব।
বৈঠকে দেশের কৃষি উন্নয়নে খাল খনন কর্মসূচির গুরুত্বও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমান সরকারও ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। তাঁর মতে, এই কর্মসূচি কৃষক ও সাধারণ মানুষের উপকারের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয়। আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে চীনের সমর্থনের কথা জানান লিউ হাইশিং।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
লিউ হাইশিং দুই দলের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
চীনা প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক পেং শিউবিনসহ দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও চীনের রাজনৈতিক দল এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
মন্তব্যসমূহ