বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মীদের বৈধ পথে ইতালিতে পাঠাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতালীয় ভাষা, পেশাগত দক্ষতা এবং দেশটির সামাজিক নিয়মকানুন সম্পর্কে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের বিনা খরচে অভিবাসনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে ‘ইতালিতে দক্ষ অভিবাসনের জন্য ভাষা, নাগরিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
ইতালীয় দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নেওয়ার নতুন প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়।
উপদেষ্টা জানান, শুরুতে সীমিত পরিসরে এই প্রক্রিয়া চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও বেশি কর্মীর জন্য সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার।
ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ ধারার আওতায় অনুমোদিত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা বিদেশি কর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।
এই ব্যবস্থায় ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রস্থান-পূর্ব প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষ কর্মীরা দেশটির বার্ষিক শ্রমিক নিয়োগের নির্ধারিত কোটার বাইরেও বৈধভাবে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন।
প্রশিক্ষণের মূল তিনটি বিষয় হলো ইতালীয় ভাষা, দেশটির নাগরিক জীবন ও সামাজিক রীতিনীতি এবং নির্দিষ্ট পেশার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা।
মঙ্গলবারের সেমিনারে আয়োজকেরা জানান, সম্ভাব্য অভিবাসীদের জন্য অনুমোদিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বিনামূল্যে করা হবে।
তবে প্রশিক্ষণ শেষ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইতালির চাকরি বা ভিসা নিশ্চিত হবে না। বৈধ নিয়োগ ও ইতালীয় কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আচরণ ও মূল্যবোধের প্রশিক্ষণকে একসঙ্গে যুক্ত করার মডেলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার এই প্রশিক্ষণপদ্ধতি দেশের বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই।
সরকার দক্ষ, নিয়মতান্ত্রিক ও স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে চায়। সম্ভব হলে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তরুণদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
ইতালীয় ভাষা প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষাও কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেমিনারে অংশ নেওয়া প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিদেশে কাজের প্রস্তুতির পাশাপাশি তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনের একটি উদাহরণ তৈরি করছেন।
দক্ষ কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন মাহ্দী আমিন।
তিনি জানান, ইতালির প্রশিক্ষণ মডেলটি জাতীয় নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিতে সরকার প্রস্তুত।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রবাসীদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের আদলে প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি প্রবাসীদের বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সহজ করার পরিকল্পনার অংশ বলে জানান তিনি।
মাহ্দী আমিন তাঁর বক্তব্যে ইতালিতে বসবাসরত আড়াই লাখের বেশি বাংলাদেশির অবদানের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ইতালির সমাজ ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। একই সঙ্গে তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।
দক্ষ অভিবাসন সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের ‘টেস্ট’ প্রকল্প এবং বস্ত্র খাতের ‘ফরম্যাজিঅনে’ প্রশিক্ষণ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
এসব প্রকল্পে নির্বাচিত সম্ভাব্য অভিবাসীদের ইতালীয় ভাষা, পেশাগত আচরণ এবং সংশ্লিষ্ট খাতের কাজের দক্ষতা শেখানো হচ্ছে।
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ড. লরা টম বন্ডে, ইতালির উপ-মিশনপ্রধান ডা. ফেদেরিকো জামপারেল্লি, ইইউ প্রতিনিধিদলের উপপ্রধান বাইবা জারিনা এবং ইতালীয় দূতাবাসের অভিবাসন উপদেষ্টা জুসেপ্পে দি জিওভান্নিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মন্তব্যসমূহ