রাজধানীসহ দেশের সব সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা বা ই-রিকশা চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আনতে নতুন বিধিমালা প্রকাশ করেছে সরকার। এর আওতায় নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, নির্দিষ্ট রুট ও জোন অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, ফুটপাত ও প্রধান বাস চলাচলের সড়কে এসব যান চলাচল করতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ১২০ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে প্রণীত বিধিমালাটি দেশের সব সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রযোজ্য হবে। এটি এস. আর. ও. নম্বর ৩৮৪-আইন/২০২৬ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না। নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। এর সঙ্গে তফসিল-২ অনুযায়ী ফি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
আবেদন ও দাখিল করা নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হবে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও তফসিল-৩ অনুযায়ী নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। কিউআর কোডযুক্ত নম্বরটি যানবাহনের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি কর্পোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি কর্পোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো নিষিদ্ধ।
নিবন্ধনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। এ সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করে ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া কোনো ই-রিকশার নিবন্ধন বা নবায়ন করা যাবে না। ফিটনেস সনদ প্রদানকারী এবং প্রতিস্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।
আগে থেকে রাস্তায় চলাচল করা ই-রিকশাগুলোর কাঠামো বুয়েটের নির্ধারিত মান ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সংশোধন করে অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে হবে।
বিধিমালায় প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়সীমা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট যানটির নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে।
প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক। কোনো যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না। গাড়িতে ত্রুটি দেখা দিলে সামনের দৃশ্যমান স্থানে ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলাচল অযোগ্য’ লেখা সাইনবোর্ড প্রদর্শন করে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা নিতে হবে।
পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বিমার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। অবৈধ ই-রিকশার চলাচল বন্ধে মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে বা পৃথকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
নতুন নিয়মে ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোরে চলতে পারবে না। প্রশাসন সময় সময় যেসব সড়কে নিষেধাজ্ঞা দেবে, সেখানেও এসব যান চলাচল করতে পারবে না। ফুটপাত ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
চালকদের সব সময় সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং এবং লেন পরিবর্তন করা যাবে না।
যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। চালক ছাড়া ই-রিকশার আকার অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী নেওয়া যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না।
এ ছাড়া ৪০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।
ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট নির্ধারণ করবে। সিটি কর্পোরেশন এলাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনের জন্য ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের সড়ক এবং নির্দিষ্ট রং ঠিক করা হবে। এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।
চালকদের দক্ষতা বাড়াতে কর্তৃপক্ষ স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে পারবে। এতে ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই-রিকশার রক্ষণাবেক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণ করবে কর্তৃপক্ষ।
ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজ ব্যবহার করতে হবে। এসব স্থানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বেসরকারি উদ্যোগ অথবা অন্য উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ও ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
চার্জিং স্টেশনে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ও গ্রিডের সংযোগ স্থাপনের বিধানও রাখা হয়েছে। এর ফলে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। পর্যায়ক্রমে বৈধভাবে নিবন্ধিত চার্জিং স্টেশনেই ব্যাটারি চার্জ করার ব্যবস্থা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
চার্জিং স্টেশন স্থাপনে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মবহির্ভূত চার্জিং বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে সংশ্লিষ্ট প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান কার্যকর হবে।
অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং এ খাতের সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, তফসিলি ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি ই-রিকশার চালক ও মালিকদের ঋণ সহায়তা দিতে পারবে।
ই-রিকশা উৎপাদন, আমদানি, ব্যবহার, ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা ও জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি কিংবা এর কোনো অংশ খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলে দেওয়া কিংবা পুড়িয়ে ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মন্তব্যসমূহ