চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে সংস্থাটির রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গেছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। ভ্যাট, আয়কর ও আমদানি-রপ্তানি শুল্ক—রাজস্ব আদায়ের প্রধান তিনটি খাতের কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ঘাটতির প্রায় অর্ধেকই এসেছে ভ্যাট থেকে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতে ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও পাওয়া গেছে ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ফলে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে আদায় হয়েছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি আগের বছরের তুলনায়ও ভ্যাট আদায় কমেছে।
আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে। এই দুই খাত থেকে প্রথম প্রান্তিকে ৪২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা থাকলেও আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ৯ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক থেকে ৪২ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এসেছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে আয়কর ও ভ্রমণ কর এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক খাতে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৮২২ কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায়ের এই পরিস্থিতির পেছনে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতিকে দায়ী করছেন এনবিআর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পাশাপাশি ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তনের প্রভাবও পড়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার নিয়মের কারণে প্রথম দিকে নিয়মিত ভ্যাট পাওয়া যায়নি। তবে এখন মাসে মাসে রিটার্ন দেওয়ার বিধান করায় ভ্যাট আদায় বাড়বে।’
এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. আবদুর রউফও ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ার পেছনে রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, তিন মাস পরপর রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম চালুর পর অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন দেয়নি। ফলে ভ্যাট পরিশোধও করেনি। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতিও আদায় কমার অন্যতম কারণ।
এদিকে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এনবিআরের এক সভায় কর্মকর্তাদের কাজ জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। সভায় এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মোট রাজস্ব আদায় সামান্য বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আদায় হয়েছিল ৯১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আদায় বেড়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তাঁর মতে, অর্থনীতির গতি কমে যাওয়া, অতিরিক্ত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং এনবিআরের প্রশাসনিক স্থবিরতা—এই তিনটি বিষয় আদায়ে প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, প্রথমত, অর্থনীতির গতি কম। দ্বিতীয়ত, বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। তাই আদায় কম দেখাচ্ছে। তৃতীয়ত, এনবিআরে কিছুটা প্রশাসনিক স্থবিরতা রয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে।
এদিকে গত তিন মাসে রাজস্ব আদায় কম হওয়ার পরও এ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি এনবিআর। ফলে সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
মন্তব্যসমূহ