ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। অর্থ পাচারের তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী পাসপোর্ট জমা না দিয়েই তাঁর দেশত্যাগের ঘটনা নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। এর মধ্যেই ফ্লাভিও ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে তিনটি সূত্রের বরাতে ফ্লাভিওর ব্রাজিল ছাড়ার খবর নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে পৌঁছেছেন।
তবে তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হন ফ্লাভিও বলসোনারো।
নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে না নিয়ে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন তিনি। ফল বাতিলের দাবিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান।
তবে সোমবার তাঁর দল লিবারেল পার্টি লুলার বিজয় মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ফ্লাভিওর দেশ ছাড়ার খবর সামনে আসে। অথচ এর আগের দিন তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রাজিল ছেড়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই।
ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলমান অর্থ পাচারের তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলেন ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট।
সোমবার তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়।
আদালত মনে করেছে, ফ্লাভিওর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তাঁর উল্লেখযোগ্য আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টিও পাসপোর্ট জব্দের সিদ্ধান্তে বিবেচনা করা হয়।
তবে অর্থ পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফ্লাভিও।
সোমবার তিনি জানিয়েছিলেন, আদালতের নির্দেশ মেনে পাসপোর্ট জমা দেবেন এবং দেশে থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আইনি মোকাবিলা করবেন।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট জমা না দেওয়ায় তাঁর ভ্রমণসংক্রান্ত নথি বাতিল করা হয়েছে বলে দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।
এরপরও তিনি কীভাবে ব্রাজিল ছাড়তে সক্ষম হলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফ্লাভিও নিয়মিত অভিবাসন তল্লাশিচৌকি ব্যবহার করে দেশ ছাড়েননি।
ফ্লাভিওর দেশত্যাগের খবর প্রকাশের পর তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ফ্লাভিও বলসোনারো ও তার পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেওয়া হবে এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।’
তবে ফ্লাভিওর স্ত্রী ও দুই মেয়ে তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর খবরও পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সুনির্দিষ্ট অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের বিরোধী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করছিলেন তাঁর রাজনৈতিক সহযোগীরা।
কিন্তু হঠাৎ দেশত্যাগের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থাপক ও সিনেটর রজেরিও মারিনহো।
তিনি সাংবাদিকদের জানান, আগের দিনই ফ্লাভিওর সঙ্গে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় ছয় কোটি ভোট পাওয়ার পর বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে ফ্লাভিওর সক্রিয় থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছিলেন তাঁরা।
তাই তাঁর আকস্মিক দেশত্যাগ রাজনৈতিক সহযোগীদের কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা ফ্লাভিওর দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ফ্লাভিওর দেশত্যাগের খবর তিনি মাত্রই জানতে পেরেছেন।
এ ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেন লুলা।
তাঁর মতে, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরিবর্তে ফ্লাভিওর উচিত ছিল ব্রাজিলে থেকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করা।
ফ্লাভিওর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ঘটনায় ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে আরও টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট লুলা এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, বলসোনারো পরিবারকে আবার ক্ষমতায় ফেরাতে ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করছে।
রোববারের নির্বাচনের আগেও বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল রয়টার্স।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে বিচারিক নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ তুলেছিলেন।
ফ্লাভিওর দেশত্যাগ নিয়ে সোমবার সাংবাদিকদের সামনে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি ট্রাম্প। তবে ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারোও ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফল মেনে না নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন।
পরে তিনি ব্রাজিলে ফিরে আসেন।
এরপর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নির্বাচনের ফল ঘিরে তাঁর সমর্থকেরা দেশটির সরকারি ভবনগুলোতেও হামলা চালিয়েছিলেন।
ফ্লাভিওর বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর বাবার সেই দেশত্যাগের ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
এদিকে ফ্লাভিওর সিনেটর হিসেবে মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। মেয়াদ শেষ হলে তিনি সংসদীয় পদমর্যাদার কারণে পাওয়া বিশেষ আইনি সুরক্ষা হারাবেন।
ফলে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের ভবিষ্যৎ এবং ব্রাজিলে ফেরার সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনে পরাজয়, আদালতের নির্দেশ অমান্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার ঘটনা ফ্লাভিও বলসোনারোকে ঘিরে ব্রাজিলের রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র: রয়টার্স।
মন্তব্যসমূহ