ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জনগোষ্ঠীর সদস্য। ভোটাধিকার ও সংসদে প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ থাকলেও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আবাসন, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তাদের বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ ও সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
ইসরাইলের নির্বাচনী রাজনীতিতে আরব নাগরিকদের গুরুত্ব বোঝার জন্য তাদের ঐতিহাসিক পরিচয়, জনসংখ্যা এবং নাগরিক অধিকার সম্পর্কে জানা জরুরি। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময়কার ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৪৮ সালের পর ইসরাইলে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিরা
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় যুদ্ধের কারণে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি নিজ বাসস্থান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বা বহিষ্কৃত হতে বাধ্য হন। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে ‘নাকবা’ বা চরম বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেন। ওই সময় প্রায় দেড় লাখ ফিলিস্তিনি আরব নিজেদের বাড়িঘরে থেকে যান। পরবর্তী সময়ে ইসরাইলের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী ‘ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক’ বা ‘ইসরাইলি আরব’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের প্রশাসনিক ও আইনগত অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। ইসরাইলের এই আরব নাগরিকরা দেশটির পাসপোর্ট ধারণ করেন এবং জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। পাশাপাশি নেসেট বা ইসরাইলের পার্লামেন্টে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগও তাদের রয়েছে।
ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৩ শতাংশ মুসলিম, ৯ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ৮ শতাংশ দ্রুজ সম্প্রদায়ের সদস্য।
ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ
বর্তমানে ইসরাইলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি আরবের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। দেশটির মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ২০ থেকে ২১ শতাংশ তারা। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচজন ইসরাইলি নাগরিকের মধ্যে প্রায় একজন এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
তাদের বসবাসের প্রধান এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের গ্যালিলি, মধ্যাঞ্চলের ‘ট্রায়াঙ্গেল’ এবং দক্ষিণের নেগেভ মরুভূমি। এ ছাড়া হাইফা, জাফা ও একরের মতো মিশ্র ইহুদি-আরব শহরেও ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের বসবাস রয়েছে।
অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও পূর্ব জেরুসালেমে বসবাসকারী প্রায় ৫৫ লাখ ফিলিস্তিনির রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের ইসরাইলের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। এসব অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলি নাগরিক ফিলিস্তিনি আরবদের এক করে দেখার সুযোগ নেই।
নাগরিকত্ব থাকলেও বৈষম্যের অভিযোগ
ইসরাইলের ফিলিস্তিনি আরবরা ভোটাধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক হলেও বাস্তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে শুরু করে জমি, আবাসন, শিক্ষা ও সরকারি বরাদ্দ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিকভাবে তারা নেসেটে প্রতিনিধি পাঠাতে পারলেও দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের প্রধান জায়নবাদী দলগুলো সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোকে বাইরে রেখেছে বা তাদের প্রান্তিক অবস্থানে রেখেছে।
আইনগত বিতর্কের অন্যতম বিষয় ২০১৮ সালে ইসরাইলের পার্লামেন্টে পাস হওয়া ‘জাতি-রাষ্ট্র আইন’। এই আইনে ইসরাইলকে ইহুদি জনগণের জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। একই সঙ্গে আরবি ভাষার রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা বাতিল করে এর বিশেষ মর্যাদা স্বীকার করা হয়। সমালোচকদের মতে, আইনটি ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের অসম অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে।
আবাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আরব শহর ও গ্রামে নতুন আবাসন নির্মাণ এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন ও বিধিনিষেধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। অনুমোদন ছাড়া নির্মিত বহু বাড়ি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। জমি অধিগ্রহণ এবং অবকাঠামোগত বরাদ্দের ক্ষেত্রেও আরব এলাকাগুলো ইহুদি অধ্যুষিত এলাকার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দের বৈষম্যও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ফিলিস্তিনি আরবদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
সামরিক সেবার ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থান আলাদা। ইসরাইলি ইহুদিদের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদান সাধারণত বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ ফিলিস্তিনি আরব নাগরিককে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাবেক সেনাসদস্যদের জন্য নির্ধারিত শিক্ষা, আবাসন ও সরকারি চাকরির কিছু সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়তে পারেন।
নির্বাচনী রাজনীতিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জনগোষ্ঠী
গাজায় ২০২৩ সাল থেকে চলা যুদ্ধ এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরে বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। নির্বাচনে তাদের ভোট ও সংসদীয় আসন সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রাম’ দল মিলিয়ে নেসেটে ১৮টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই হিসাব সত্য হলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট কিংবা বিরোধী শিবির—উভয়ের জন্যই তাদের অবস্থান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট ফলাফল, আসনসংখ্যা এবং সরকার গঠনের সমীকরণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের তারিখ ও নির্ভরযোগ্য ফলাফল যাচাই করা প্রয়োজন। সরবরাহ করা মূল প্রতিবেদনে নির্বাচনের তারিখ ও ফলাফলের বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
সব মিলিয়ে, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের অবস্থান একদিকে নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অভিযোগে চিহ্নিত। নিজেদের ফিলিস্তিনি পরিচয় বজায় রেখেও ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তাদের ভূমিকা দেশটির ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্যসমূহ