আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়ম ঠেকাতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি ও পরিবেশ নিয়ে আগামী নভেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
সিইসি জানান, নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য কেবল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা নয়। ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনেও একই মানদণ্ড অনুসরণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় কমিশন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে মান বজায় রাখা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা ধরে রাখার চেষ্টা করা হবে। সম্ভব হলে আরও ভালো নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত না হলেও প্রার্থীদের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে পারে বলে মনে করেন সিইসি।
এ কারণে ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাসির উদ্দিন জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে কমিশন।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শুধু কমিশনের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়; প্রার্থী, রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনের দায়িত্বশীল ভূমিকাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা প্রতিরোধকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন।
সিইসি জানান, অতীতের অভিজ্ঞতায় ইউপি নির্বাচনে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তাই এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা এবং আচরণবিধি বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ লক্ষ্যে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে।
তবে পরিকল্পনার সব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
নির্বাচনের আচরণবিধি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিইসি আরও জানান, কমিশন কোনো পক্ষের চাপ ছাড়াই কাজ করছে। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন একসঙ্গে সম্পন্ন না করে ধাপে ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের।
সিইসি জানান, প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং এরপর পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন শেষ করতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে।
তবে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে এসএসসি পরীক্ষা ও বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য বন্যার বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ফলে নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রম ও আবহাওয়াসহ সংশ্লিষ্ট বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করবে কমিশন।
২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচনব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানান নাসির উদ্দিন।
এ লক্ষ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সিইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
হালনাগাদ কার্যক্রমে প্রায় ১০ লাখ নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তরুণদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এবং নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজনের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশি, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং কারাবন্দিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরির বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
নির্বাচনী কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সিইসি।
তাঁর মতে, ভোটাররা যেন কোনো বাধা ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন এবং ভোট শেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করা কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও সাধারণ ভোটারদের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
মন্তব্যসমূহ