আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে আসন্ন পবিত্র রমজান মাসের আগেই ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে খুচরা বাজারে দাম সহনীয় রাখতে খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক ছাড়ের জোর দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকরা। তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর এ প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) সচিবালয়ে রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি প্রস্তুতি, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি ও বাজারমূল্য পর্যালোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক অংশীজন বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে।
বৈঠকে অংশ নিয়ে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, বৈশ্বিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম টানা ঊর্ধ্বমুখী। এর পাশাপাশি জাহাজভাড়াসহ সামগ্রিক আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান নির্ধারিত দামে বাজারে তেল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে রমজানের আগেই সমন্বয় করে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর দাবি জানান তাঁরা। মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।
অন্যদিকে খেজুর আমদানিকারকেরা উল্লেখ করেন, বর্তমানে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ও করভার প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অতিরিক্ত শুল্কায়নমূল্য এবং পরিবহন জটিলতার কারণে স্থানীয় বাজারে খেজুরের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে বিকল্প দীর্ঘ রুটে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে খরচ আরও বেড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা দূর না হলে রমজানে সরবরাহ চেইনে সংকট তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় ১২টি দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আসে। সব ধরনের খেজুরের ওপর ঢালাও শুল্কায়ন না করে জাত ও প্রকৃত ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে যৌক্তিক শুল্ক নির্ধারণ করা দরকার। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে দ্রুত আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রমজানকে সামনে রেখে গত বছরের তুলনায় নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৮ লাখ ২৩ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার টন বেশি। একই সময়ে চিনি আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টনে (বেড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন)। এ ছাড়া ছোলার আমদানি ১২ হাজার টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার টনে এবং মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন। পাশাপাশি খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন।
বৈঠকে পোলট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, খামার পর্যায়ে ডিমের হালি ও মুরগির দাম বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে এবং বড় কোনো রোগবালাই না থাকায় রমজানে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে না। তবে বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন অভিযোগ করেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রাসী ভূমিকার কারণে ক্ষুদ্র ডাল মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বাণিজ্যমন্ত্রী বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধ এবং রমজানে নিরবচ্ছিন্ন পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। বৈঠকে ট্যারিফ কমিশন, এনবিআর, টিসিবি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআই এবং আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্যসমূহ