যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে অনড় ইরান। উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়া জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে ফি আরোপের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করতে চায় তেহরান।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করেও হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলতি মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় ইরান ৬০ দিন কোনো ফি ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে। তবে তেহরানের দাবি, এই চুক্তির ভাষা অনুযায়ী কোন জাহাজ চলবে এবং কোন পথে চলবে, তা নিয়ন্ত্রণের অধিকার ইরানের রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্থায়ীভাবে এই নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি পেতে চায় ইরান। ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায়ও তেহরান অন্য কোনো ইস্যুতে অগ্রসর হবে না, যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মীমাংসা হয়।
যদি ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো না হয়, তবে আগস্টের মাঝামাঝি থেকে ইরান জাহাজ চলাচলের ওপর ফি আরোপ শুরু করতে পারে। তবে কত টাকা বা কীভাবে এই ফি আদায় করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হতো। ফলে এখানে ইরানের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে জাহাজ চলাচলে খরচ, বিলম্ব ও ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ইরানের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন নিজে সিদ্ধান্ত না নিলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলে কোনো টোল আদায় করা যাবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে বা ফি আরোপ করতে পারে না।
ইরানের অবস্থান হলো, অন্তর্বর্তী চুক্তির সময়ে তারা ফি নেবে না, তবে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার কথা থাকলেও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো বাধ্যতামূলক নয় বলে মনে করছে তেহরান।
ওমান হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ উপকূলজুড়ে অবস্থিত। ইরান জানিয়েছে, জলপথে জাহাজ চলাচলের পথ নির্ধারণ নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সপ্তাহান্তে ওমানের পাশ দিয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া চলাচলের চেষ্টা করা চারটি জাহাজে ইরান গুলি চালিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বল্প সময়ের তীব্র গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধের আগের অবস্থায় পরিস্থিতি ফিরতে দেওয়া হবে না। নতুন ব্যবস্থায় কোন জাহাজ কীভাবে হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করবে ও বের হবে, তা ইরান নির্ধারণ করতে চায়। কোনো জাহাজকে ইরানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে হলে সেটির প্রবেশ ঠেকানোর অধিকারও রাখতে চায় তেহরান।
আরেক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরান এখন দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা আদায়ের ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ দেখছে। তাঁর দাবি, বিরোধের খরচ বাড়লে জাহাজ মালিক দেশগুলো শেষ পর্যন্ত ইরানের ব্যবস্থাপনা মেনে নেবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রও তা মেনে নিতে বাধ্য হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হয়তো পরিস্থিতি ভুলভাবে মূল্যায়ন করছে। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেছেন, সংঘাত আবার জ্বলে ওঠার আশঙ্কা অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি। কারণ, কোনো পক্ষই নিজেদের পরাজিত মনে করছে না।
হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে বিভক্ত। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী এটি আন্তর্জাতিক প্রণালী হিসেবে বিবেচিত, যেখানে অবাধ চলাচলের অধিকার থাকে। তবে ইরান এখন সেই প্রতিষ্ঠিত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছে বলে মনে করছেন সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ