দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে তিন মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কোর্সের ৭ম ব্যাচের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বুধবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
‘দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ প্রকল্পের আওতায় একযোগে সারা দেশে এই প্রশিক্ষণ শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম। সঞ্চালনা করেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। এতে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের প্রতিনিধি এবং অনলাইনে প্রায় পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের অগ্রাধিকার। এই প্রকল্পের আওতায় ৭ম ব্যাচে ৪ হাজার ৮০০ তরুণ-তরুণী কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং ও গ্রাফিক ডিজাইনের মতো চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষণ তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে। এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পথও সুগম হবে। বেকারত্ব কমানো এবং পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে এই কার্যক্রম ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম বলেন, শিক্ষিত বেকার যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রশিক্ষণার্থীরা আন্তরিকতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষ করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন।
ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম বলেন, বাংলাদেশের অনেক ফ্রিল্যান্সার আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। তবে তাদের অনেকে নিজেদের সাফল্যের গল্প প্রকাশ করেন না। তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের অর্জন ও অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৭৩ কোটি ৭৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৬ হাজার শিক্ষিত যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়।
বর্তমানে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলায় এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা ৭ম ব্যাচে প্রতিটি জেলা থেকে ৭৫ জন করে মোট ৪ হাজার ৮০০ জন অংশ নিচ্ছেন।
১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এবং ন্যূনতম এইচএসসি পাস তরুণ-তরুণীরা এই প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ছয়টি ব্যাচে ১৯ হাজার ২০০ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ হাজার ৩৫৩ জন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন।
এ পর্যন্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মোট আয় ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৯০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৯ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮৭ টাকা। সব মিলিয়ে তাদের মোট উপার্জন দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৪৯ লাখ ৭৩ হাজার ২১৫ টাকা। প্রশিক্ষণার্থীদের আয় বাড়াতে প্রতিটি জেলায় মেন্টরিং ক্লাসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এবারের ব্যাচে ভর্তির জন্য লক্ষাধিক আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার আবেদনকারী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। পরে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ৪ হাজার ৮০০ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়।
প্রশিক্ষণার্থীরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে তিন মাসে মোট ৬০০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নেবেন। প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, ফ্রিল্যান্সিং, বেসিক ইংরেজি, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফট স্কিল, স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিক ডিজাইন ও ভিডিও এডিটিং।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত ভাতা, খাবার এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের সনদপত্র দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা নিয়মিত কার্যক্রম তদারকি করছেন।
মন্তব্যসমূহ