যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন লাখো মানুষ। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে তাদের অনেকেই এখন মুখোমুখি হচ্ছেন আরেক ভয়ংকর বিপদের। ইয়েমেনে মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহভাজন ঘটনা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের কারণে বাড়িঘর ছেড়ে পালানো মানুষের মধ্যে কলেরাসহ প্রতিরোধযোগ্য বিভিন্ন রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, গত ৬ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের সপ্তাহে ইয়েমেনে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহভাজন ঘটনা ছিল ২১৭টি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবরের সপ্তাহে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪৭টিতে।
অর্থাৎ তিন সপ্তাহের ব্যবধানে সংক্রমণের সন্দেহভাজন ঘটনা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনযাত্রায়। সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে দুই লাখের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। তাদের অনেকে অস্বাস্থ্যকর ও অপর্যাপ্ত সুবিধার আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছেন।
আর কলেরা এমন একটি রোগ, যা দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আশ্রয়শিবিরে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও চিকিৎসার ঘাটতি থাকলে পরিস্থিতি আরও দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক জরুরি কার্যক্রমের পরিচালক অ্যানেট হেইনজেলম্যান সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলো এখন প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য রোগের আরেকটি হুমকির মুখে পড়েছে।
তার মতে, জরুরি অর্থায়ন, নিরাপদ পানি, টিকাদান এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইয়েমেনে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৮ হাজার ৩৪টি সন্দেহভাজন কলেরা সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে এ রোগে ২৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গত চার সপ্তাহেই চলতি বছরের মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘটেছে।
সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা যাচ্ছে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। আবিয়ান, লাহিজ, আল-দালেয়া, তাইজ ও এডেন, এই পাঁচ গভর্নরেটেই মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের ৯২ শতাংশ ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় একটি অংশ এসব এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। পূর্বাঞ্চলের হাদরামাউতের দুর্গম আশ্রয়শিবিরগুলোতেও কলেরার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্গম এসব এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইয়েমেনে কলেরা অবশ্য নতুন কোনো রোগ নয়। দীর্ঘদিনের সংঘাত, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সংকট এবং দারিদ্র্যের কারণে দেশটিতে কয়েক বছর ধরেই রোগটির প্রকোপ বাড়া-কমা করছে।
২০১৭ সালে ইয়েমেনে কলেরার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। তখন কয়েক লাখ মানুষ আক্রান্ত হন এবং অন্তত দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
এবার পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত। কয়েক বছর ধরে চলা ভঙ্গুর শান্ত পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার পর বহু মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফলে খাবার, পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট একসঙ্গে তৈরি হয়েছে।
কলেরা দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র ডায়রিয়া ও বমি হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই রোগ প্রাণঘাতীও হতে পারে।
তাই ইয়েমেনে এখন শুধু যুদ্ধ বন্ধ করাই নয়, নিরাপদ পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ইয়েমেনে আগামী ৯০ দিনের জরুরি কার্যক্রম চালাতে তাদের ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
এই অর্থ দিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি বাড়ানো, দ্রুত সাড়াদানকারী দল মোতায়েন, কলেরার চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে গোলাবারুদের পাশাপাশি ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য এখন আরেকটি নীরব বিপদ তৈরি হয়েছে। নিরাপদ পানি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে বাস্তুচ্যুত মানুষের এই সংকট আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
মন্তব্যসমূহ