ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বহুবার বলেছেন, রাজনীতি ফুটবলের বাইরে থাকা উচিত এবং ফুটবলও রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাজুড়ে চলমান ৪৮ দলের বিশ্বকাপে তাঁর নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক অবস্থান ঘিরে আবারও প্রশ্ন উঠছে—ফুটবল কি সত্যিই রাজনীতির বাইরে থাকতে পারছে?
বিশ্বকাপের ছয় সপ্তাহের এই আয়োজনের কেন্দ্রে আছেন সুইস-ইতালীয় ইনফান্তিনো। আর্থিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে ফিফার সাম্রাজ্য এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের একটি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন, কাতার, সৌদি আরব ও মরক্কোকে ঘিরে তাঁর নানা পদক্ষেপ নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
দুর্নীতিকাণ্ডে জর্জরিত সেপ ব্লাটারের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৬ সালে ফিফা সভাপতি হন ইনফান্তিনো। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ফুটবলকে শান্তি, ঐক্য ও সংলাপের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে তাঁর বহু সিদ্ধান্তই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও বিতর্কিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ইনফান্তিনোর সম্পর্কও গভীর। তাঁর স্ত্রী লিনা আল-আশকার লেবাননের নাগরিক। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি নিজেও লেবাননের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তাঁর অবস্থান ও পদক্ষেপ আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়েও ইনফান্তিনোর অবস্থান ছিল সতর্ক। ২০১৭ সালে তিনি বলেছিলেন, কোনো দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চাইলে অংশগ্রহণকারী সব দল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ থাকতে হবে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইরান, সোমালিয়া ও ইরাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঘটনায় ফিফার ভূমিকা সমালোচিত হয়েছে।
ইরানের কোচ আমির গালেনোয়ি অভিযোগ করেছেন, বিশ্বকাপে তাঁদের দল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে সোমালিয়ান রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
ইনফান্তিনোর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বিতর্কের বড় কারণ। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিষেক অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনোর উপস্থিতি, ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফার অফিস নেওয়া এবং ট্রাম্পকে প্রথম ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেওয়ার ঘটনাকে অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
কাতার বিশ্বকাপ নিয়েও ইনফান্তিনোর ভূমিকা আলোচিত। ২০২২ বিশ্বকাপের আগে কাতারের মানবাধিকার পরিস্থিতি, অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু এবং শ্রম অধিকার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ওঠে। তখন ইনফান্তিনো সমালোচকদের পাল্টা জবাব দিয়ে বলেন, তিনি নিজেকে কাতারি, আরব, আফ্রিকান, সমকামী, প্রতিবন্ধী ও অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে অনুভব করছেন। তাঁর ওই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
২০৩০ বিশ্বকাপ স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর যৌথ আয়োজনে দেওয়ার সিদ্ধান্তও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে। শতবর্ষ স্মরণে দক্ষিণ আমেরিকায় তিনটি ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও মূল আয়োজন যাচ্ছে ইউরোপ ও আফ্রিকায়। সমালোচকেরা মরক্কোর মানবাধিকার পরিস্থিতি ও পশ্চিম সাহারা ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ২০৩৪ বিশ্বকাপ সৌদি আরবকে দেওয়ার সিদ্ধান্তে। বিড প্রক্রিয়া খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হওয়া, সৌদি আরবের একমাত্র বিডদাতা হয়ে ওঠা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ—সব মিলিয়ে ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্ত আবারও সমালোচনার মুখে পড়ে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও ইনফান্তিনোর ভূমিকা বিতর্কিত। গাজায় যুদ্ধ ও বিপুল প্রাণহানির পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। তবে ফিফা ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ক্লাব ফুটবল নিয়ে অভিযোগ উঠলেও ফিফা বিষয়টিকে জটিল আইনগত প্রশ্ন হিসেবে দেখেছে।
ফিফা পরে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে সংলাপ উৎসাহিত করার কথা জানায়। তবে ভ্যাঙ্কুভারে ফিফা কংগ্রেসে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের করমর্দন করানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান জিবরিল রাজুব বলেন, তাঁরা কষ্টে আছেন।
এর মধ্যেই ফিফা ও ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি হয়। গাজা পুনর্গঠনে ফুটবলে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার কথা বলা হলেও ওই বোর্ডে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্ব না থাকায় সমালোচনা তৈরি হয়।
ইনফান্তিনো ফুটবলকে শান্তির মাধ্যম হিসেবে দেখাতে চান। কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তগুলো বারবার বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। বিশ্বকাপ যত বড় হচ্ছে, ফিফার অর্থনৈতিক প্রভাবও তত বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রশ্ন—ফুটবল কি এখনো শুধু খেলা, নাকি বৈশ্বিক রাজনীতির এক শক্তিশালী কূটনৈতিক মঞ্চ?
সূত্র: মিডল ইস্ট আই














মন্তব্যসমূহ