তৈরি পোশাক খাতে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের চলমান প্রকল্পের তহবিল ও আওতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক মারা কে. ওয়ারউইকের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং (ভিজিএফ) পাইলট প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এ প্রকল্পের জন্য বিজিএমইএ প্রাথমিকভাবে ৩১টি কারখানার তালিকা দিয়েছিল। সেখান থেকে আটটি কারখানা নিয়ে কাজ শুরু করবে বিশ্বব্যাংক। তবে টেকসই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর চাহিদা ও আগ্রহ বিবেচনায় ৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল এবং আটটি কারখানার পরিসর যথেষ্ট নয় বলে বৈঠকে তুলে ধরে বিজিএমইএ। এ কারণে প্রকল্পটির অর্থায়ন ও আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা এখন শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডসহ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাক উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে পানির ব্যবহার কমানো, বর্জ্যপানি পরিশোধন এবং পানি পুনর্ব্যবহারের তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।
ঢাকার নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সুরক্ষার পাশাপাশি রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা জানান, পোশাক কারখানায় টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয়। এ কারণে উদ্যোক্তাদের জন্য এ ধরনের প্রকল্প আর্থিকভাবে কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের যথাযথ মূল্য না পাওয়াকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তাদের মতে, বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে অনুদান অথবা দীর্ঘমেয়াদি ও শূন্য সুদে সহজ শর্তে বড় পরিসরে অর্থায়ন পাওয়া গেলে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর পরিবেশবান্ধব রূপান্তর আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে।
আলোচনায় পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে আসে। অনেক কারখানায় নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনের জায়গা থাকলেও কাছাকাছি উপযুক্ত জলাশয় কিংবা ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। একই সঙ্গে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার এককভাবে বড় শোধনাগার স্থাপনের আর্থিক সক্ষমতা নেই বলে জানানো হয়।
সমাধান হিসেবে স্থায়ী পাইপলাইনের পরিবর্তে লরি বা ট্যাংকারের মাধ্যমে শিল্পবর্জ্য অপসারণ এবং ক্লাস্টারভিত্তিক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পানি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই রূপান্তরের কার্যক্রম শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও দ্রুত সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
পরিবেশগত নীতি ও সরকারি বিধিবিধানে হঠাৎ পরিবর্তন না আনার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বিজিএমইএ নেতারা বলেন, নতুন পরিবেশগত নীতি বা নিয়ম কার্যকরের আগে শিল্প উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সময় ও পূর্বাভাস দেওয়া প্রয়োজন। নীতির পূর্বাভাসযোগ্যতা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগে কারখানাগুলো আরও উৎসাহিত হবে।
বৈঠক শেষে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল বিজিএমইএর প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবুজ রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে লজিস্টিকস ও সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেয়।
বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও পরিচালক ড. মো. হাসিব উদ্দিন অংশ নেন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলে ছিলেন লিড ওয়াটার স্পেশালিস্ট ডেভিড মেলকম লর্ড, সিনিয়র ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন স্পেশালিস্ট রোকেয়া আহমেদ, ওয়াটার স্পেশালিস্ট মো. মাহাদী হাসান এবং এনভায়রনমেন্টাল স্পেশালিস্ট বুশরা নিশাত।
এ ছাড়া বিজিএমইএর মহাসচিব মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. সাহেদুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্যসমূহ