প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অপরাধের ধরন বদলে যাচ্ছে। ফলে হত্যা, মাদক, চুরিসহ প্রায় সব ধরনের ফৌজদারি অপরাধ এবং ক্লুলেস মামলার রহস্য উন্মোচনে ডিজিটাল ফরেনসিক এখন তদন্তের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। অপরাধ তদন্তে থানা পুলিশ ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংখ্যা হু হু করে বাড়লেও সেই তুলনায় সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে আলামতের দীর্ঘ জট তৈরি হচ্ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া।
তদন্ত সংস্থা সিআইডির ঢাকা ও খুলনা ল্যাবের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই ল্যাবে ২৬ হাজার ৯৪২টি মামলার বিপরীতে ৭৯ হাজার ১৪৪টি আলামত জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪৩টি মামলার ৫৫ হাজার ৯৫৭টি আলামতের পরীক্ষা শেষ হলেও এখনো আটকে রয়েছে ২৫ হাজার ৫৬৪টি ডিজিটাল আলামত। ২০১২ সালে যেখানে মাত্র ৭টি মামলায় ১৮টি আলামত পরীক্ষা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জুন মাস নাগাদ তা বেড়ে ২ হাজার ৬০৩ মামলায় ১১ হাজার ১১১ আলামতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ডিভাইসের চাহিদা বেড়েছে প্রায় ৩৭২ গুণ। ২০১৭ সালে মামলার আলামত নিষ্পত্তির হার ৯০ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের জুনে তা নেমে এসেছে ৫০ দশমিক ১৩ শতাংশে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আলামতভেদে একটি ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে আবেদনকারীদের গড়ে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। রিপোর্ট দেরিতে আসায় তদন্ত কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারছেন না। এর সুযোগ নিয়ে অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে প্রমাণ নষ্ট করার সুযোগ পাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও স্বীকারোক্তি নেওয়ার পরও কেবল সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য তদন্তকারী সংস্থাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৮ মাস। গত জুলাইয়ে সেই রিপোর্ট পাওয়ার পর অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হয়।
ল্যাব কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ্লিকেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবই এই জটের মূল কারণ। তবে এই স্থবিরতা কাটাতে প্রতিটি বিভাগে ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কোরিয়ান সংস্থা কোইকার সহায়তায় চট্টগ্রামে একটি বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাব তৈরি করা হয়েছে, যা দ্রুতই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবে।
মন্তব্যসমূহ