ঢাকা    শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাতের পর কো-পাইলটের উদ্দেশ্য কী ছিল, উঠছে যেসব প্রশ্ন

ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাতের পর কো-পাইলটের উদ্দেশ্য কী ছিল, উঠছে যেসব প্রশ্ন
ছবি : সংগৃহীত
ফলো করুন

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক হামলার ঘটনায় এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হামলাকারী হিসেবে অভিযুক্ত নাম প্রকাশ না হওয়া কো-পাইলট কেন ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঘটনাটির পেছনে কোনো সংগঠন বা দেশের সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দখলদার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে ইসরাইলবিরোধী ‘অপপ্রচারের’ ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বা মোটিভ এখনো নিশ্চিত হয়নি বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।

বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহু দাবি করেন, ওই কো-পাইলট ‘ইসলামপন্থি উগ্রবাদী ভাবধারায়’ দীক্ষিত হয়েছিলেন। তার দাবি, ইরান ও তাদের মিত্ররা বিদেশে ইসরাইলিদের ওপর হামলা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে কো-পাইলটের হামলার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দেননি।

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইটটির ঘটনায় নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজেকে ইসরাইলের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন। এরই মধ্যে চলতি মাসের শেষদিকে দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রভাব এখনই নির্ধারণ করার সময় হয়তো আসেনি।

তিনি বলেন, এর একটি রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে—এটি নেতানিয়াহুর পছন্দ নয় এমন কিছু বিষয়কে সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আরেকটি বার্ষিকী ঘনিয়ে আসার বিষয়টিও রয়েছে। তার মতে, এর পরিবর্তে ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার আলোচনা সামনে আসতে পারে।

লেভি আরও বলেন, এই ঘটনা নেতানিয়াহুর কাঙ্ক্ষিত একটি ফলাফলের দিকে নতুন গতি দিতে পারে—তা হলো ইরানের ওপর আবারও তীব্র হামলা চালানোর পক্ষে জনমত তৈরি করা। একই সঙ্গে এটি নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেও সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এর আগে মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে ইসরাইলের শত্রুরা দেশটির ওপর হামলার চেষ্টা চালাতে পারে—এমন ইঙ্গিত রয়েছে। তবে তার বিরোধীরা ওই বক্তব্যকে তথ্যপ্রমাণহীন ভয় দেখানোর চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎসও বিমানটির ঘটনাকে ‘জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি নেতানিয়াহুর আগের সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তিনি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা সতর্কতা বা অ্যালার্ট জারি করলে বিদেশে থাকা শত্রুদের পাশাপাশি দেশের ভেতরের সাবেক কর্মকর্তাদেরও তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।

তবে ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এই ঘটনার সঙ্গে আগের নিরাপত্তা সতর্কবার্তার যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মঙ্গলবার রাতে তিনি নেতানিয়াহুর কাছ থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্রিফিং পেয়েছিলেন। বুধবার লাপিদ বলেন, ওই ব্রিফিংয়ে বিমানটির ঘটনার কাছাকাছি কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি।

ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, বিমানটির ঘটনার পর তার প্রতিক্রিয়া আকস্মিক নয়; বরং বিভিন্ন সংকটকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর তার দীর্ঘদিনের কৌশলের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র টিচিং ফেলো এবং ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহু এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যাত্রীরা ইসরাইলে অবতরণের পর তাকে ওই ঘটনার সময় কো-পাইলটকে ঘায়েল করতে সহায়তা করা এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে ব্রেগম্যান মনে করেন না যে, এর ফলে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন। তার মতে, ঘটনাটি নেতানিয়াহুকেও অন্য সবার মতোই বিস্মিত করেছে।

ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহুর জন্য একমাত্র সম্ভাব্য সুবিধা হতে পারে, যদি তদন্তে ইরানের সঙ্গে এই হামলার যোগসূত্র নিশ্চিত হয়। সে ক্ষেত্রে তেহরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ওই সংঘাত থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিয়ে আসছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আল জাজিরাকে ব্রেগম্যান বলেন, ঘটনাটিতে নিরাপত্তার বড় ধরনের ত্রুটি ছিল, যার তদন্ত করা হবে। তার মতে, ঘটনাটি আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত; তবে কয়েকজন সাহসী যাত্রী এবং সৌভাগ্যের কারণে তা এড়ানো গেছে।

বুধবার মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, বিমানটি ছিনতাইয়ের ব্যর্থ চেষ্টার পেছনে কারা ছিল, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে বলার সময় আসেনি। তবে তিনি কো-পাইলটের কর্মকাণ্ডকে ‘অভাবনীয় মাত্রার ধর্মান্ধতা ও ঘৃণার’ ফল হিসেবে বর্ণনা করেন।

নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত ইহুদিবিদ্বেষের পরিবেশের সঙ্গে ওই হামলার যোগসূত্র থাকতে পারে।

গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটও আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন দেশ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপন-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিমানটির হামলার পেছনে যে বৈশ্বিক ক্ষোভকে তিনি দায়ী করছেন, তার প্রসঙ্গ টেনে গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরাইল সাতটি ফ্রন্টে লড়াই করার পাশাপাশি একটি ‘অষ্টম ফ্রন্টের’ বিরুদ্ধেও লড়ছে।

তিনি তখন বলেন, এটি ‘সত্যের লড়াই’ এবং এই লড়াই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে। তিনি আল জাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগও তোলেন।

আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক নেতানিয়াহুর এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি ও অব্যাহত অভিযানের অংশ হিসেবেই এ ধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে। আল জাজিরার দাবি অনুযায়ী, গাজায় ইসরাইলি হামলায় তাদের ১২ জন সহকর্মী নিহত হয়েছেন।

চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র কনসালটিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ইসরাইল সরকার বিমানটির হামলার ঘটনাকে জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করতে চাইবে।

তার মতে, এই ঘটনা ইসরাইলের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে থাকা মানসিক আঘাতকে আরও তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দেশগুলোর নীতিকে ‘দ্বিমুখী’ মনে করা ইসরাইলিদের ক্ষোভও এতে আরও বাড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে বিমানটির ঘটনায় কো-পাইলটের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তিনি একাই এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না এবং এর সঙ্গে কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের সরাসরি যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। ফলে নেতানিয়াহু বা অন্য কোনো পক্ষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে ঘটনার চূড়ান্ত মোটিভ হিসেবে বিবেচনা করার আগে তদন্তের ফলাফল জানা প্রয়োজন।

ট্যাগ : ইসরাইল ফ্লাইদুবাই এফজেড১০৭৩

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬


ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাতের পর কো-পাইলটের উদ্দেশ্য কী ছিল, উঠছে যেসব প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ০২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক হামলার ঘটনায় এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হামলাকারী হিসেবে অভিযুক্ত নাম প্রকাশ না হওয়া কো-পাইলট কেন ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঘটনাটির পেছনে কোনো সংগঠন বা দেশের সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দখলদার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে ইসরাইলবিরোধী ‘অপপ্রচারের’ ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বা মোটিভ এখনো নিশ্চিত হয়নি বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।

বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহু দাবি করেন, ওই কো-পাইলট ‘ইসলামপন্থি উগ্রবাদী ভাবধারায়’ দীক্ষিত হয়েছিলেন। তার দাবি, ইরান ও তাদের মিত্ররা বিদেশে ইসরাইলিদের ওপর হামলা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে কো-পাইলটের হামলার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দেননি।

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইটটির ঘটনায় নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজেকে ইসরাইলের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন। এরই মধ্যে চলতি মাসের শেষদিকে দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রভাব এখনই নির্ধারণ করার সময় হয়তো আসেনি।

তিনি বলেন, এর একটি রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে—এটি নেতানিয়াহুর পছন্দ নয় এমন কিছু বিষয়কে সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আরেকটি বার্ষিকী ঘনিয়ে আসার বিষয়টিও রয়েছে। তার মতে, এর পরিবর্তে ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার আলোচনা সামনে আসতে পারে।

লেভি আরও বলেন, এই ঘটনা নেতানিয়াহুর কাঙ্ক্ষিত একটি ফলাফলের দিকে নতুন গতি দিতে পারে—তা হলো ইরানের ওপর আবারও তীব্র হামলা চালানোর পক্ষে জনমত তৈরি করা। একই সঙ্গে এটি নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেও সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এর আগে মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে ইসরাইলের শত্রুরা দেশটির ওপর হামলার চেষ্টা চালাতে পারে—এমন ইঙ্গিত রয়েছে। তবে তার বিরোধীরা ওই বক্তব্যকে তথ্যপ্রমাণহীন ভয় দেখানোর চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎসও বিমানটির ঘটনাকে ‘জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি নেতানিয়াহুর আগের সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তিনি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা সতর্কতা বা অ্যালার্ট জারি করলে বিদেশে থাকা শত্রুদের পাশাপাশি দেশের ভেতরের সাবেক কর্মকর্তাদেরও তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।

তবে ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এই ঘটনার সঙ্গে আগের নিরাপত্তা সতর্কবার্তার যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মঙ্গলবার রাতে তিনি নেতানিয়াহুর কাছ থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্রিফিং পেয়েছিলেন। বুধবার লাপিদ বলেন, ওই ব্রিফিংয়ে বিমানটির ঘটনার কাছাকাছি কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি।

ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, বিমানটির ঘটনার পর তার প্রতিক্রিয়া আকস্মিক নয়; বরং বিভিন্ন সংকটকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর তার দীর্ঘদিনের কৌশলের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র টিচিং ফেলো এবং ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহু এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যাত্রীরা ইসরাইলে অবতরণের পর তাকে ওই ঘটনার সময় কো-পাইলটকে ঘায়েল করতে সহায়তা করা এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে ব্রেগম্যান মনে করেন না যে, এর ফলে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন। তার মতে, ঘটনাটি নেতানিয়াহুকেও অন্য সবার মতোই বিস্মিত করেছে।

ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহুর জন্য একমাত্র সম্ভাব্য সুবিধা হতে পারে, যদি তদন্তে ইরানের সঙ্গে এই হামলার যোগসূত্র নিশ্চিত হয়। সে ক্ষেত্রে তেহরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ওই সংঘাত থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিয়ে আসছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আল জাজিরাকে ব্রেগম্যান বলেন, ঘটনাটিতে নিরাপত্তার বড় ধরনের ত্রুটি ছিল, যার তদন্ত করা হবে। তার মতে, ঘটনাটি আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত; তবে কয়েকজন সাহসী যাত্রী এবং সৌভাগ্যের কারণে তা এড়ানো গেছে।

বুধবার মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, বিমানটি ছিনতাইয়ের ব্যর্থ চেষ্টার পেছনে কারা ছিল, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে বলার সময় আসেনি। তবে তিনি কো-পাইলটের কর্মকাণ্ডকে ‘অভাবনীয় মাত্রার ধর্মান্ধতা ও ঘৃণার’ ফল হিসেবে বর্ণনা করেন।

নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত ইহুদিবিদ্বেষের পরিবেশের সঙ্গে ওই হামলার যোগসূত্র থাকতে পারে।

গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটও আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন দেশ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপন-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিমানটির হামলার পেছনে যে বৈশ্বিক ক্ষোভকে তিনি দায়ী করছেন, তার প্রসঙ্গ টেনে গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরাইল সাতটি ফ্রন্টে লড়াই করার পাশাপাশি একটি ‘অষ্টম ফ্রন্টের’ বিরুদ্ধেও লড়ছে।

তিনি তখন বলেন, এটি ‘সত্যের লড়াই’ এবং এই লড়াই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে। তিনি আল জাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগও তোলেন।

আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক নেতানিয়াহুর এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি ও অব্যাহত অভিযানের অংশ হিসেবেই এ ধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে। আল জাজিরার দাবি অনুযায়ী, গাজায় ইসরাইলি হামলায় তাদের ১২ জন সহকর্মী নিহত হয়েছেন।

চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র কনসালটিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ইসরাইল সরকার বিমানটির হামলার ঘটনাকে জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করতে চাইবে।

তার মতে, এই ঘটনা ইসরাইলের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে থাকা মানসিক আঘাতকে আরও তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দেশগুলোর নীতিকে ‘দ্বিমুখী’ মনে করা ইসরাইলিদের ক্ষোভও এতে আরও বাড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে বিমানটির ঘটনায় কো-পাইলটের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তিনি একাই এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না এবং এর সঙ্গে কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের সরাসরি যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। ফলে নেতানিয়াহু বা অন্য কোনো পক্ষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে ঘটনার চূড়ান্ত মোটিভ হিসেবে বিবেচনা করার আগে তদন্তের ফলাফল জানা প্রয়োজন।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ