মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে কারাবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ বিষয়ে আদেশ দেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
শুনানিতে তারেক সাঈদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মাহমুদুল হুসাইন রুবেল। মুন্সিগঞ্জ কারাগারে গভীর রাতে কারারক্ষীদের হাতে তারেক সাঈদ মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্ত এবং যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা চেয়ে আবেদন করেন তিনি। তবে বিচারিক তদন্ত চেয়ে করা আবেদনটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা হয়নি উল্লেখ করে পরে তা প্রত্যাহার করেন আইনজীবী।
শুনানিতে রুবেল বলেন, “১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মুন্সিগঞ্জ কারাগারে তারেক সাঈদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে অতর্কিত হামলা চালান কয়েকজন রক্ষী। লাঠি দিয়ে আঘাত করায় মাথায় আঘাত পান তিনি। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও তাকে ব্যাপকভাবে নির্যাতন করা হয়। কারাসুপারের নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। এজন্য আমরা এ ঘটনার তদন্তসহ তারেক সাঈদকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার প্রার্থনা করছি।”
তবে আইনজীবীর এই অভিযোগের বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য উৎস প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
শুনানিতে প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন জানান, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় তারেক সাঈদ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং তাকে কনডেম সেলে রাখার কথা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত বা আসামিদের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সাধারণত প্রসিকিউশন আপত্তি করে না বলেও জানান তিনি।
জহিরুল আমিন বলেন, “সাধারণত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কোনো অভিযুক্ত বা আসামি অসুস্থ হলে প্রসিকিউশন থেকে আপত্তি জানানো হয় না। মানবিক দিক থেকেই তাদের এ সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু তারেক সাঈদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাটির গতকাল (বুধবার) নির্ধারিত দিন ছিল। তিনি এজলাসে থাকা কাঠগড়ায়ও উপস্থিত ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কোনো অভিযোগ তিনি করেননি। বেশ সুস্থভাবেই তিনি হাজির হয়েছিলেন।”
এ পর্যায়ে তারেক সাঈদ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং কনডেম সেলে থাকার বিষয়টি আবেদনে উল্লেখ না করার কারণ জানতে চান ট্রাইব্যুনাল।
জবাবে আইনজীবী রুবেল জানান, তারেক সাঈদ দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের সাধারণ ওয়ার্ডে রয়েছেন। তার দাবি, মুন্সিগঞ্জ কারাগারে কথিত হামলার পর কোনো চিকিৎসাসনদ ছাড়াই তাকে কিশোরগঞ্জ কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। অথচ এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে পাঠানোর ক্ষেত্রে চিকিৎসাসনদ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর কারাবিধি অনুসরণ করে তারেক সাঈদকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
পরে আইনজীবী মাহমুদুল হুসাইন রুবেল জানান, তারেক সাঈদ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে দুটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। এসব মামলায় গত ১০ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর তারেক সাঈদকে আবার আদালতে হাজির করা হলে প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে তাকে এক দিনের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন গভীর রাতে মুন্সিগঞ্জ কারাগারে কয়েকজন রক্ষী তার ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন তিনি। হামলার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল বলেও আইনজীবীর অভিযোগ।
এদিকে কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতাদের গুম ও হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুটি মামলায় তারেক সাঈদের পাশাপাশি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নামও আসামির তালিকায় রয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর এসব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। তবে প্রসিকিউশন আরও দুই মাস সময় চাইলে ট্রাইব্যুনাল আগামী ৩০ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারণ করেন।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য, ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা আবদুল মান্নান, জহিরুল ইসলাম সুমন ও আসাদুজ্জামান বাবুলকে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ২৭ নভেম্বর কুমিল্লার লাকসামে বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজকে গুম করা হয়। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত চলছে।
মন্তব্যসমূহ