বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানিতে নতুন করে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ১৪০ দশমিক ০৪ মার্কিন ডলার পর্যন্ত কাউন্টারভেইলিং ডিউটি (সিভিডি) বা ভর্তুকিবিরোধী শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারত। দেশটি এর মাত্র চার দিন আগে বাংলাদেশি পাটপণ্যে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যে পাঁচ বছরের জন্য সিভিডি আরোপের সুপারিশ করেছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়।
ভারতের ২০২৫ সালের এক তদন্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাটপণ্যে ভর্তুকি দেওয়ার ১২টি অভিযোগ তোলা হয়।
ডিজিটিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে বাংলাদেশের ২৪টি পাটকল সহযোগিতা করেছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে তিনটি রপ্তানিকারক গ্রুপে ভাগ করে তাদের জন্য আলাদা শুল্কহার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতি টনে ১০১ দশমিক ৫৪ থেকে ১৩২ দশমিক ৩৬ ডলার শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তদন্তে সহযোগিতা করা বাংলাদেশের বাকি ১৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি টনে ১১৬ দশমিক ৪৮ ডলার সিভিডি আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। আর তদন্তে সহযোগিতা না করা বাংলাদেশের অন্যান্য সব পাটপণ্য রপ্তানিকারকের ক্ষেত্রে প্রতি টনে ১৪০ দশমিক ০৪ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।
নেপালের রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত শুল্কহার প্রতি টনে ৫৪ দশমিক ৭৭ থেকে ৬০ দশমিক ৫৪ ডলার।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) ভারতের এই শুল্ক আরোপের উদ্যোগকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছে। সংগঠনটির সভাপতি তাপস প্রামাণিক বলেন, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক কার্যকর থাকার পর একই পণ্যে কীভাবে আবার সিভিডি আরোপ করা যায়, তা তাঁর বোধগম্য নয়। তাঁর মতে, সরকারের উচিত এ উদ্যোগের প্রতিকার চেয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নালিশ করা।
এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি পাটপণ্য আমদানিতে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে ভারত। এর আগে বাংলাদেশ ও নেপালের পাটের সুতা ও টুইন, হেসিয়ান কাপড় এবং পাটের স্যাকিং ব্যাগে প্রতি টনে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক কার্যকর ছিল। পরে বাংলাদেশি পাটের স্যাকিং কাপড়ও এর আওতায় আনা হয়।
একই পণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং ও সিভিডি আরোপের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ। বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় দুই দেশের যৌথ কার্যদলের বৈঠকেও আলোচনা করবে বাংলাদেশ।
ডিজিটিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৭ হাজার টনে নেমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১১৬ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮২ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়।
বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন ভারতের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশি পাট খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ভারত এসব করছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রতিবাদ না হওয়ায় ভারত এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ভারতে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যে ভর্তুকির অভিযোগ এবং এ নিয়ে সিভিডি আরোপের উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভারতীয় তদন্তের আইনগত ভিত্তি, ভর্তুকির হিসাব, ক্ষতির তথ্য এবং সম্ভাব্য দ্বৈত প্রতিকারের বিষয়ে লিখিতভাবে ডিজিটিআরের কাছে আপত্তি জানিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, পাটপণ্যের ওপর ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে এখনো কার্যকর রয়েছে। একই পণ্যে আবার ভর্তুকির অভিযোগে সিভিডি আরোপের উদ্যোগকে মূলত ‘ডাবল রেমেডি’ বা একই পরিস্থিতির জন্য দ্বৈত প্রতিকার হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানিতে ভারতের বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধও রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে জারি করা ওই বিধিনিষেধের ফলে বাংলাদেশের পাটপণ্য শুধু নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ভর্তুকি ও প্রতিকারসংক্রান্ত চুক্তির বিভিন্ন ধারা এবং ভারতের কাস্টমস ট্যারিফ আইনের ৯বি ধারার উল্লেখ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, একই পরিস্থিতির জন্য অ্যান্টি-ডাম্পিং ও সিভিডি একসঙ্গে আরোপ করা যায় না। এ কারণে চলমান সিভিডি তদন্তের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তা বন্ধ করার জন্য ডিজিটিআরকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ।
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, সিভিডির তদন্ত থেকে সরে আসতে লিখিতভাবে ভারতকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দিল্লিতে দুই দেশের যৌথ কার্যদলের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ এবং সিভিডি আরোপের উদ্যোগের বিষয়টি রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর আশা, বৈঠকে এ বিষয়ে সমাধানের উপায় বের হবে।
মন্তব্যসমূহ