সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করা ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে থাকা ইসরায়েলি যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে নিতে ইসরায়েলি সামরিক বিমানকে সৌদি আরবে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল তেল আবিব। তবে রিয়াদ সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্থানীয় সময় বুধবার দুইজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েল চেয়েছিল তাদের সামরিক বিমান সৌদি আরবে গিয়ে সেখান থেকে ইসরায়েলি যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসুক। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে সৌদি সরকারের জনসংযোগ কার্যালয়ের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে একটি সুপার হারকিউলিস সামরিক বিমান পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানেই তাদের গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইদুবাইও জানিয়েছে, যাত্রীরা ওই বিমানেই যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার কথা।
ঘটনার শুরুতে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমান দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে যাচ্ছিল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার দাবি করেন, বিমানের সহকারী পাইলট বা কো-পাইলট প্রথমে পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তিনি বিমানটি ইচ্ছাকৃতভাবে বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেন বলে দাবি করেন নেতানিয়াহু।
তবে বিমানে থাকা যাত্রীরা ওই কো-পাইলটকে ধরে ফেলেন এবং নিয়ন্ত্রণে রাখেন। এরপর বিমানে থাকা যাত্রীবেশী অন্য পাইলটরা বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সেটিকে নিরাপদে সৌদি আরবে অবতরণ করান বলে ইসরায়েলি পক্ষের বর্ণনায় বলা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছেন। এই চুক্তির আওতায় কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
তবে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে বাস্তব ও স্পষ্ট কোনো পথ তৈরি না হলে তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেবে না।
এদিকে বুধবার সৌদি আরবের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইসরায়েলি ও সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো বৈঠক হওয়ার খবর অস্বীকার করেছেন। এর আগে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন সৌদি কর্মকর্তা ছিলেন বলেও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।
তবে সৌদি ওই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, এমন কোনো বৈঠক হয়নি।
সেই ফ্লাইটে যা ঘটেছিল
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে প্রায় ১৮০ যাত্রী নিয়ে উড্ডয়ন করেছিল ফ্লাইদুবাইয়ের বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইট। উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর মাঝআকাশে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হলে বিমানটি ছিনতাই বা বিধ্বস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
যাত্রীরা ইসরায়েলের চ্যানেল–১২, চ্যানেল–১৫ এবং টাইমস অব ইসরায়েলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, বিমানের সামনের দিক থেকে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পান তারা। ককপিটের দরজা খুললে সেখানে রক্ত দেখতে পান।
মিয়াম নামের এক ইসরায়েলি যাত্রী জানান, এক পাইলট ফোল্ডিং ছুরি দিয়ে অন্য পাইলটকে আঘাত করেন। এ সময় হামলাকারী পাইলট বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করছিলেন বলেও কথা ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমান ক্রু এবং কয়েকজন ইসরায়েলি যাত্রী ককপিটে ঢুকে ওই পাইলটকে কাবু করেন। যাত্রীরা জানান, ওই সময় তাদের মনে হয়েছিল তারা হয়তো আর জীবিত ফিরতে পারবেন না।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, জর্ডান-সৌদি আরব সীমান্তের কাছে পৌঁছানোর সময় বিমানটি মাত্র এক মিনিটের মধ্যে ৩৩ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ১৭ হাজার ফুটে নেমে যায়।
সংঘর্ষের সময় পাইলটরা প্রথমে আন্তর্জাতিক জরুরি সংকেত ‘স্কোয়াক কোড ৭৭০০’ এবং পরে সম্ভাব্য বিমান ছিনতাইয়ের সংকেত ‘কোড ৭৫০০’ সক্রিয় করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি পরে ক্রু ও যাত্রীরা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকের বেসামরিক ও সামরিক বিমানঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করে। এতে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয় বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঘটনার পর ইসরায়েল দ্রুত তার নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য একটি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। তবে সেটি সৌদি আকাশসীমায় প্রবেশ করেনি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং তাবুকে আটকে থাকা যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মন্তব্যসমূহ