ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পুনরায় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সামনে আসার পর দেশটিকে ফিরে আসার বিষয়ে স্বাগত জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বুধবার বলেছেন, ইউরোপের সঙ্গে সম্ভাব্য বিভিন্ন সম্পর্কের ‘সুবিধা ও অসুবিধা’ বিবেচনা করে তাঁর মধ্য-বামপন্থী লেবার সরকার চাইলে ‘পুরো পথ’ এগিয়ে ইইউতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে। তাঁর এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ব্রেক্সিট নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভাজনমূলক বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।
বার্নহামের মন্তব্যের তাৎক্ষণিক সমালোচনা করেছে ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা। এর ফলে ২০১৬ সালের গণভোটের পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করা ব্রেক্সিট বিতর্ক নতুন করে তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জুলাইয়ে লেবার পার্টির এমপিরা কিয়ার স্টারমারকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর বার্নহাম সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলবার লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ২০২০ সালে ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ ‘লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে’।
বার্নহাম বলেন, ব্রেক্সিটের কারণে ‘এক দশক ধরে প্রবৃদ্ধি কমেছে’ এবং ব্রিটেনকে তার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে ‘দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক’ নির্ধারণ করতে হবে।
চলতি বছরের শেষ দিকে ২৭ সদস্যের ইইউর সঙ্গে পরিকল্পিত শীর্ষ সম্মেলনের আগে ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ‘বিভিন্ন বিকল্প’ তুলে ধরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
বুধবার বিবিসি রেডিওকে বার্নহাম বলেন, ইউরোপীয় সিঙ্গেল মার্কেট ও কাস্টমস ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, ‘অথবা আমরা পুরো পথ এগিয়ে যেতে পারি’।
তিনি বলেন, ‘সুতরাং স্পষ্টতই এমন কিছু বিকল্প রয়েছে, যেগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন এবং কোনটি বাস্তবায়নযোগ্য, আর প্রতিটির কী সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে, তা আমাদের দেখতে হবে।’
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদ্রিদে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে মাখোঁ ব্রিটেনের ইইউতে ফেরার ধারণাকে স্বাগত জানান।
মাখোঁ বলেন, ‘ব্রিটিশরা যদি ফিরে আসতে চায় এবং প্রধানমন্ত্রী যদি সেই পথে এগিয়ে যান, তাহলে আমি মনে করি এটি তাঁর দেশের জন্য এবং ইউরোপীয়দের জন্য উভয়েরই খুব ভালো খবর।’ এরপর তিনি বলেন, ‘ফিরে আসুন।’
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও মাখোঁর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেন, যুক্তরাজ্য যদি পুনরায় যোগ দেওয়ার আবেদন করে, ‘তাহলে অবশ্যই স্পেন তা স্বাগত জানাবে এবং ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের জন্য আবারও দু'হাত বাড়িয়ে দেবে।’
এদিকে ব্রিটেনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণের বিষয়ে বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়ার দায়িত্ব লন্ডনের।
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র বালাজ উজভারিই বলেন, ‘যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভবিষ্যতে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নিতে চায়, তা তুলে ধরার দায়িত্ব যুক্তরাজ্য সরকারের।’
তিনি বলেন, ‘তারা যেসব বিকল্প প্রস্তাব দেবে, সেগুলো নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’
ব্রেক্সিট নিয়ে জরিপ
২০১৬ সালের গণভোটে ব্রিটিশরা ইইউ ছাড়ার পক্ষে ৫২ শতাংশ এবং বিপক্ষে ৪৮ শতাংশ ভোট দেওয়ার পর দেশটি ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়।
জুনে সুরভেশন পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, আবার গণভোট হলে ৫৫ শতাংশ ভোটার ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দেবেন।
যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ডেভিড হেনিগ এএফপিকে বলেন, বার্নহাম দেশটিতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত এই মতটি উপলব্ধি করছেন যে ব্রেক্সিট ব্যর্থ হয়েছে এবং লেবার পার্টির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমানে বার্নহাম স্টারমারের ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ইশতেহারের আওতায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই ইশতেহারে কাস্টমস ইউনিয়নে যোগ দেওয়া, সিঙ্গেল মার্কেটে ফিরে যাওয়া অথবা ইইউর সঙ্গে অবাধ চলাচলের সুযোগ পুনর্বহালের বিষয়গুলো নাকচ করা হয়েছিল।
বার্নহামের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের প্রচারে যাওয়ার আগে তিনি এসব ‘লাল রেখা’র কিছু পরিবর্তন করতে চান বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতা সান্দ্রো গোজি, যিনি ইইউ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক নিয়ে একটি পার্লামেন্টারি উদ্যোগের চেয়ারম্যান, এএফপিকে বলেন, বার্নহামের প্রকাশ্যে বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখার আগ্রহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ তৈরি করেছে।
তবে ‘ইউকে ইন আ চেঞ্জিং ইউরোপ’ থিংকট্যাংকের পরিচালক আনন্দ মেনন সতর্ক করে বলেন, বার্নহামের মন্তব্যকে ব্রিটেনের ইইউতে ফিরে যাওয়ার যাত্রার সূচনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘তিনি যা বলেছেন, তা মনে হচ্ছে—আমরা এখন এ বিষয়ে আলোচনা করব। তাঁর মন্ত্রিসভায় এমন বেশ কয়েকজন রয়েছেন, যারা চান না তিনি ইউরোপ নিয়ে অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় করুন।’
বার্নহাম ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন এবং এর আগে বলেছিলেন, তাঁর জীবদ্দশাতেই ব্রিটেন আবার ইইউতে ফিরে আসবে বলে তিনি আশা করেন।
তবে জুনে পার্লামেন্টে ফিরে আসা এবং স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে যাওয়ার সফল প্রচারণার সময় বার্নহাম বলেছিলেন, তিনি ব্রেক্সিট বিতর্ককে আবার সামনে আনতে চান না।
ইইউবিরোধী রিফর্ম ইউকের উপনেতা রিচার্ড টিস বলেন, বার্নহাম ‘পেছনের দরজা দিয়ে আমাদের আবার ব্রাসেলসে ঢোকানোর চেষ্টা করছেন’। কনজারভেটিভ পার্টির উপনেতা অ্যালেক্স বুর্গহার্ট প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘পেছনের দিকে তাকানোর’ অভিযোগ করেন।
জুলাইয়ে ব্রাসেলসে যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। তবে স্টারমারকে সরিয়ে দেওয়ার পর সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়।
ইইউর এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, জোটটি নভেম্বর মাসে সম্মেলনটি আয়োজনের চেষ্টা করছে। তবে এর তারিখ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘স্পষ্টতই আবহ ইতিবাচক এবং একটি সফল শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি অবশ্যই রয়েছে।’
দুই পক্ষ ওই শীর্ষ সম্মেলনে খাদ্য ও প্রাণীর নিরাপত্তা মান, যুব চলাচল কর্মসূচি এবং তাদের কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্যব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে কয়েকটি চুক্তি উপস্থাপনের আশা করছিল।
তবে নির্দিষ্ট কিছু শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ইইউর ‘মেড ইন ইউরোপ’ পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিটিশ উদ্বেগের কারণে আলোচনা থমকে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্তব্যসমূহ