ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত গতির সামরিক অভিযান দেশটির দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক তেলবাজারেও। এক দশকের বেশি সময় ধরে উত্তর ইয়েমেনের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসা হুথিরা সম্প্রতি সরকারপন্থি বাহিনীর কাছ থেকে নতুন কিছু এলাকা দখল করেছে।
এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপরও হুমকি তৈরি করেছে গোষ্ঠীটি। এই প্রণালি এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো হুথিদের হামলার হুমকির মুখে রয়েছে।
সামরিক কাঠামোর দিক থেকে হুথিদের একসময় বেশ অনানুষ্ঠানিক ও বিচ্ছিন্ন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হতো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাদের ‘র্যাগট্যাগ ফাইটিং ফোর্স’ বা অপরিকল্পিত সশস্ত্র বাহিনী হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। তবে গত দুই দশকে তাদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইয়েমেনের ভেতরে হামলা চালানোর পাশাপাশি ইসরাইল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধেও হামলা চালিয়েছে। তাদের হাতে ঠিক কত ধরনের ও কতসংখ্যক অস্ত্র রয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে তাদের সামরিক সক্ষমতার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য থেকে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। এর অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’। ধর্মীয় নেতা হুসেইন আল-হুথি ১৯৯৪ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। জাইদি শিয়া মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই গোষ্ঠী উত্তর ইয়েমেনের জন্য আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন চায়।
হুসেইনের ভাই আবদুল-মালিক আল-হুথির নেতৃত্বে ২০০০-এর দশকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে হুথিরা।
গোষ্ঠীটির বহুল পরিচিত স্লোগান হলো—‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আমেরিকার মৃত্যু, ইসরাইলের মৃত্যু, ইহুদিদের ওপর অভিশাপ, ইসলামের বিজয়।’
২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের তীব্র পর্যায়ে রাজধানী সানা–সহ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি অংশ দখল করে নেয় হুথিরা। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সরকারপন্থি বাহিনী। এসব বাহিনীকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক জোট সমর্থন করে।
২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে হুথিদের বিরুদ্ধে। মূলত ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলের ওপর চাপ তৈরির অংশ হিসেবে এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে হুথিরা জানিয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজও তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
হুথিরা ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তবে অন্তত ২০০০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ইরান তাদের আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ইরানের কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানি এই সহায়তার একটি বড় অংশ তদারক করতেন বলে ধারণা করা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিনি নিহত হন।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের সঙ্গে ইরান-সমর্থিত অন্যান্য সংগঠনেরও যোগাযোগ রয়েছে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ অন্যতম। ইরাক ও সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর সদস্যদের সঙ্গে হুথি নেতাদের বৈঠকের তথ্যও পাওয়া গেছে।
হুথিদের কাছে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাইরে তাদের হামলা চালানোর সক্ষমতা সীমিত বলে মনে করা হয়।
তবে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে তাদের সক্ষমতা রয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তারা উত্তর ইসরাইলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরও রয়েছে। সানা থেকে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের দূরত্ব প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার।
মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা জটিল ও ব্যয়বহুল। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে হুথিদের নিজেদের উদ্যোগে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থাকার সম্ভাবনা কম। বরং এসব অস্ত্র ইরান থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
ফলে হুথিদের সামরিক সক্ষমতার বিকাশ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের সংঘাতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের ওপর হুমকি তৈরি হওয়ায় এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও পড়ছে।
মন্তব্যসমূহ