যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ইউএফসি আয়োজনকে ঘিরে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করেছিল একটি অনলাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী। বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন ব্যবহার করে আশপাশের ভবনে আতঙ্ক সৃষ্টি, মানুষকে সরিয়ে দেওয়া এবং এরপর নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এক স্বজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে হামলার আগেই ওই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৪ জুন হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইউএফসি ফ্রিডম ২৫০’। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত প্রথম পেশাদার ক্রীড়া আয়োজন। একই দিন ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন। এ কারণে অনুষ্ঠানকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পরিকল্পনাকারীরা বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন। পরে এফবিআই ১৯ বছর বয়সী ওহাইওর বাসিন্দা টাইজেন প্রপারের মোবাইল ফোনে একটি সিগন্যাল গ্রুপ চ্যাটের সন্ধান পায়। ওই চ্যাটে প্রায় ১৯ জন সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট এলাকা ও দায়িত্ব ভাগ করে আরও কয়েকটি ছোট গ্রুপেও আলোচনা চলছিল।
তদন্তে জানা যায়, গ্রুপটির সদস্যরা হোয়াইট হাউসের আশপাশের এলাকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন এবং হামলার পর পালানোর পথও নির্ধারণের চেষ্টা করছিলেন। তারা বিস্ফোরক বহনে সক্ষম ড্রোন তৈরির পাশাপাশি হামলার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা করেন।
হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথম জানতে পারে একটি পরিবারের উদ্বেগের সূত্র ধরে। প্রপারের মা তার ছেলের আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, তার ছেলে অনলাইনে কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কিনছেন এবং কথোপকথনে ‘রিকন’ ও ‘মিশন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করছেন।
পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রপার তার মাকে জানিয়েছিলেন, তিনি অনলাইনে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। তবে তাদের সঙ্গে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ছেলের কথাবার্তা ও আচরণে উদ্বিগ্ন হয়ে তার পরিবার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়।
এরপর ১০ জুন প্রপারের বাড়িতে যায় পুলিশ। তদন্তকারীরা সেখানে অস্ত্র, গুলি, বডি আর্মারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দেখতে পান। পরে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে চলা গ্রুপ চ্যাটের সন্ধান পাওয়া যায়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, গ্রুপটির সদস্যরা টিকটক, সিম্পলএক্স, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া নামে যোগাযোগ করতেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন এবং সরকার উৎখাত করে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মতো ধারণা নিয়ে আলোচনা করতেন বলে তদন্তকারীদের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রুপটির সদস্যরা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। তদন্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইলন মাস্ক এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম উঠে আসে। তাদের হত্যার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কয়েকজন রাজনীতিকের ছবিও চ্যাটে শেয়ার করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
‘হান্টার্স’ নামের একটি চ্যাটে হোয়াইট হাউসের আশপাশের এলাকার আকাশচিত্র এবং পালানোর পথ নিয়ে আলোচনা করা হয়। হামলার পর কোথায় আশ্রয় নেওয়া হবে, সে বিষয়েও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নেব্রাস্কার একটি পুরোনো গির্জাকে সম্ভাব্য নিরাপদ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
এফবিআইয়ের তদন্তে আরও জানা যায়, হামলার জন্য শুধু ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনাই ছিল না; গুলি চালানোর একটি দলও প্রস্তুত করা হচ্ছিল। তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, চ্যান্ডলার স্ক্যাগস নামে ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে সম্ভাব্য স্নাইপার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রপার তাকে ওয়াশিংটনে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল বলে প্রসিকিউটরদের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার কয়েক দিন আগে গ্রুপের এক সদস্য মাইকেল থমাস চ্যাটে লেখেন, ‘এটা রক্তক্ষয়ী ঘটনা হতে যাচ্ছে।’ এরপর অন্য সদস্যরাও হামলা সফল করার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
তদন্তে প্রপারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে। তিনি ওহাইওর একটি ল্যান্ডস্কেপিং প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দেন এবং অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনেন। তার পরিবার পরে জানতে পারে, উচ্চবিদ্যালয়ের সমাপনী উপলক্ষে পাওয়া প্রায় ৩ হাজার ডলার তিনি এসব সরঞ্জাম কেনার কাজে ব্যয় করেছিলেন।
প্রপারের ঘর তল্লাশি করে একটি নোটবুকও উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে বিভিন্ন রাজনীতিক ও তারকার নামের পাশাপাশি সরকার সম্পর্কে তার বিভিন্ন বিশ্বাস ও অভিযোগের কথা লেখা ছিল।
১১ জুন জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রপার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ইউএফসি আয়োজনকে ঘিরে সমন্বিত হামলার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন বলে প্রসিকিউটররা দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রপার জানান, গ্রুপটির সদস্যরা মনে করতেন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভেঙে ফেলে’ নতুন করে গড়ে তুলতে হবে এবং ওই হামলা তাদের কথিত বিপ্লবের সূচনা করতে পারে।
এরপর প্রপারকে আটক করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আদালতের নথিতেও তার সহিংসতার চিন্তাভাবনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে প্রপার গ্রেপ্তার হওয়ার পরও গ্রুপটির অন্য সদস্যরা হামলার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে। তাদের কথোপকথনে হামলা থেকে সরে আসার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে—এমন মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছিল বলে তদন্তকারীদের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রপারের পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার ব্রায়ান ওমর রোয়া, মাইকেল অ্যালান থমাস, মিসৌরির ড্যানিয়েল এসক্রিজ এবং নেব্রাস্কার আব্রাহাম হারমোসিলো আলভারেজসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তকারীদের দাবি, আলভারেজ ‘শেফার্ড’ নামে গ্রুপটিতে পরিচিত ছিলেন এবং হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। অন্যদিকে থমাসের বাড়ি থেকে রাইফেল, গুলি ও একটি পিস্তল জব্দ করা হয়েছে বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
পরে ফেডারেল প্রসিকিউটররা কয়েকজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং হত্যার ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।
এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল বলেন, পুরো অভিযানটি ছিল একাধিক অঙ্গরাজ্যজুড়ে পরিচালিত একটি সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা অভিযান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড় ধরনের জনসমাগমের অনুষ্ঠানকে ঘিরে মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি শনাক্ত এবং তা মোকাবিলায় এফবিআই ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো কাজ করেছে।
মন্তব্যসমূহ