সন্ত্রাসবাদের প্রভাবের দিক থেকে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে শীর্ষে উঠে এসেছে পাকিস্তান। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) প্রকাশিত গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স-২০২৬-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। সূচকে পাকিস্তান ৮ দশমিক ৫৭৪ স্কোর নিয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে।
সূচকে পাকিস্তানের শীর্ষে থাকার একটি গ্রাফিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করে দেশটির সাবেক মার্কিন দূত হুসেইন হাক্কানি পাকিস্তানের অতীত নীতির সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘বাড়ির পেছনে সাপ পুষলে একদিন সেই সাপের ছোবল বাড়ির মানুষকেও খেতে হয়।’
হাক্কানি আরও বলেন, পাকিস্তান পাঁচ দশক আগে উগ্রপন্থি জিহাদি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়া শুরু করেছিল। এখন সন্ত্রাসী হামলার শিকার দেশগুলোর তালিকায় পাকিস্তান শীর্ষে রয়েছে।
আইইপির সূচক অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন এবং দেশটিতে ১ হাজার ৪৫টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ২০১৩ সালের পর ওই বছরই পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
এর আগে গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সের প্রতিটি সংস্করণেই পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ১০টি দেশের মধ্যে ছিল। তবে ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত ২০২৬ সালের সূচকে প্রথমবারের মতো দেশটি তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে।
আইইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে টানা ষষ্ঠ বছরের মতো দেশটিতে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা ২০২৪ সালের ১ হাজার ৯৮টি থেকে কমে ২০২৫ সালে ১ হাজার ৪৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
এ সময়ে জিম্মি করার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানে জিম্মি করার ঘটনা ছিল ১০১টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৬৫৫টিতে পৌঁছায়।
আইইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেই সন্ত্রাসী তৎপরতার বড় অংশ কেন্দ্রীভূত। ২০২৫ সালে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পাকিস্তানের মোট সন্ত্রাসী হামলার ৭৪ শতাংশের বেশি এবং সন্ত্রাসবাদে মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের টানাপোড়েন এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) সহিংসতা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
আইইপির হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। টানা পঞ্চম বছরের মতো সংগঠনটি পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মোট মৃত্যুর ৫৬ শতাংশের জন্য টিটিপিকে দায়ী করা হয়েছে। ওই বছর সংগঠনটি ৫৯৫টি হামলা চালায়, যাতে ৬৩৭ জন নিহত হন। আগের বছরের তুলনায় এসব হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে টিটিপিকে ২০২৫ সালের বিশ্বের তৃতীয় প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী চারটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র টিটিপির হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে বলেও আইইপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানে ২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে হামলার কথা উল্লেখ করেছে আইইপি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোয়েটা রেলস্টেশনের কাছে রেললাইনে বিস্ফোরণের পর বিএলএর সদস্যরা একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৪৪২ জনকে জিম্মি করেন। ওই ঘটনায় ২১ জন জিম্মি, চারজন সামরিক সদস্য এবং ৩৩ জন হামলাকারী নিহত হন।
বিএলএর হামলায় চীনা নাগরিক এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোও ক্রমবর্ধমানভাবে লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের পরিস্থিতির বিপরীতে ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যুর সংখ্যা ২৮ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৮২ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যাও প্রায় ২২ শতাংশ কমে ২ হাজার ৯৪৪টিতে নেমেছে।
আইইপি জানিয়েছে, বিশ্বের ৮১টি দেশে সন্ত্রাসবাদের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে ১৯টি দেশে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
তবে বিশ্বে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটেছে পাঁচটি দেশে—পাকিস্তান, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, নাইজার এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদে মোট মৃত্যুর প্রায় ২০ শতাংশ পাকিস্তানেই ঘটেছে বলে আইইপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্তব্যসমূহ