হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া ১১ হাজারেরও বেশি নাবিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)। ওই জলসীমায় একটি পণ্যবাহী জাহাজে নতুন করে হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইএমওর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গোয়েজ জানান, ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজ ও নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। এ কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ওমানের দাহিত বন্দরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ৭ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। তবে হামলায় কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার জাহাজটি ছিল সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী এভার লাভলি। হামলার পরও জাহাজটি নিজস্ব সক্ষমতায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ দিকের রুট দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যায়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, হামলার পেছনে ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানের পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি (পিজিএসএ) জানিয়েছে, অনুমোদিত নৌপথের বাইরে চলাচলকারী কোনো জাহাজের নিরাপত্তার দায়িত্ব তারা নেবে না। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অননুমোদিত রুট ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট যেকোনো ঝুঁকি বা ক্ষতির দায়ভার সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিক, অপারেটর ও ক্যাপ্টেনকেই বহন করতে হবে।
আইএমও প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গোয়েজ বলেন, হামলার শিকার জাহাজটি জাতিসংঘের উদ্ধার অভিযানের আওতাভুক্ত ছিল না। তবুও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “নাবিকদের নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান পুনরায় শুরু করা হবে না।”
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরে শত শত জাহাজ ও হাজার হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর গত মঙ্গলবার আইএমও একটি বৃহৎ মানবিক উদ্ধার অভিযানের ঘোষণা দেয়, যেখানে ইরান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট উপকূলীয় দেশগুলো সহযোগিতায় সম্মত হয়েছিল। কিন্তু নতুন এই হামলার ঘটনায় পুরো উদ্যোগ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ‘মেরিটাইম সার্ভিস ফি’ আদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের ফি আরোপের বিরোধিতা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং সেখানে কোনো দেশের একতরফাভাবে টোল বা ফি আরোপের অধিকার নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি