ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ১১ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

মার্কিন-ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের মরণকামড়

মার্কিন-ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের মরণকামড়
সংগৃহীত ছবি
ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের যে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, নতুন এই সমঝোতা সেই অবস্থানকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, নেতানিয়াহু বছরের পর বছর নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যিনি ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থানকে ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে সক্ষম। রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ছিল তার রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। একসময় কূটনৈতিক মহলে তাকে ‘আমেরিকার কানপড়া দাতা’ বলেও আখ্যায়িত করা হতো।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শান্তি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছেন, তা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন ওয়াশিংটনের নীতিকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে ইসরায়েলকে অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত কূটনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই ধরনের চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক সংঘাতের স্থায়ী সমাধান চায়, অন্যদিকে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠী লেবানন প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা কিংবা সমঝোতার পথে এগোনো—উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তার জন্য।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেনিস রসের মতে, নেতানিয়াহু এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন যেখানে ওয়াশিংটনের চাপ এবং নিজ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে, আবার সংঘাত দীর্ঘায়িত করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।

নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আবিভ বুশিনস্কি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, এই সমঝোতার ফলে নেতানিয়াহু শুধু কৌশলগতভাবেই নয়, রাজনৈতিকভাবেও দুর্বল অবস্থানে চলে গেছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সম্পর্কেও নতুন ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

যদিও নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে তিনি সম্প্রতি দাবি করেছেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনও অংশীদারত্বের ভিত্তিতেই রয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অর্জনকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন বলছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে হোয়াইট হাউসের বর্তমান অগ্রাধিকার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ এড়ানো, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে আরব দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার করেছে ওয়াশিংটন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়া ইসরায়েলকে আগের তুলনায় কম প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। অতীতে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই নেতানিয়াহুকে শান্তি প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পথ অনুসরণ করছে।

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। যে কৌশলের ওপর ভিত্তি করে তিনি দীর্ঘদিন নিজের নেতৃত্বের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি সেই ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: রয়টার্স

ট্যাগ : বিশ্ব সংবাদ মধ্যপ্রাচ্য ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ

বাংলা ভিউজ

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মার্কিন-ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের মরণকামড়

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের যে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, নতুন এই সমঝোতা সেই অবস্থানকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, নেতানিয়াহু বছরের পর বছর নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যিনি ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থানকে ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে সক্ষম। রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ছিল তার রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। একসময় কূটনৈতিক মহলে তাকে ‘আমেরিকার কানপড়া দাতা’ বলেও আখ্যায়িত করা হতো।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শান্তি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছেন, তা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন ওয়াশিংটনের নীতিকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে ইসরায়েলকে অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত কূটনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই ধরনের চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক সংঘাতের স্থায়ী সমাধান চায়, অন্যদিকে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠী লেবানন প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা কিংবা সমঝোতার পথে এগোনো—উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তার জন্য।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেনিস রসের মতে, নেতানিয়াহু এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন যেখানে ওয়াশিংটনের চাপ এবং নিজ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে, আবার সংঘাত দীর্ঘায়িত করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।

নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আবিভ বুশিনস্কি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, এই সমঝোতার ফলে নেতানিয়াহু শুধু কৌশলগতভাবেই নয়, রাজনৈতিকভাবেও দুর্বল অবস্থানে চলে গেছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সম্পর্কেও নতুন ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

যদিও নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে তিনি সম্প্রতি দাবি করেছেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনও অংশীদারত্বের ভিত্তিতেই রয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অর্জনকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন বলছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে হোয়াইট হাউসের বর্তমান অগ্রাধিকার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ এড়ানো, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে আরব দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার করেছে ওয়াশিংটন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়া ইসরায়েলকে আগের তুলনায় কম প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। অতীতে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই নেতানিয়াহুকে শান্তি প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পথ অনুসরণ করছে।

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। যে কৌশলের ওপর ভিত্তি করে তিনি দীর্ঘদিন নিজের নেতৃত্বের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি সেই ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: রয়টার্স


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ