মুসলিম পারিবারিক আইন ও ইসলামী মিরাসব্যবস্থার মৌলিক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন বা বিধান মুসলিম সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তাহাফফুজে মাদারিসে কওমিয়া বাংলাদেশের গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়া আলেম-উলামারা। তারা শরিয়াহসম্মত হেবা ব্যবস্থাকে বিকৃত বা সীমিত করার যেকোনো উদ্যোগ থেকে সরকারকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে কথিত ‘জীবনস্বত্ব হেবা’ সংক্রান্ত শরিয়তবিরোধী আইন বাতিলের দাবি জানান।
মঙ্গলবার রাজধানীর আফতাবনগর মাদ্রাসা মিলনায়তনে ‘তাহাফফুজে ফিকরে দেওবন্দ, বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং জীবনস্বত্ব রেখে হেবা আইন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক মুফতি মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে এতে সঞ্চালনা করেন সদস্যসচিব মুফতি হাফিজ উদ্দিন।
বক্তারা বলেন, ইসলামী শরিয়তে হেবা একটি স্বীকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ বিধান। মুসলমানের সম্পত্তি হস্তান্তর, দান ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। এসব বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন বা প্রয়োগ করা হলে তা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অধিকার ও প্রচলিত পারিবারিক আইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তারা বলেন, ‘জীবনস্বত্ব হেবা’ নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে, যার মাধ্যমে শরিয়াহসম্মত হেবা কার্যকর হওয়ার মৌলিক শর্ত ও মালিকানার বিধান পরিবর্তিত বা অকার্যকর হয়, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এ বিষয়ে সরকারকে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে শরিয়াহসম্মত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা ফিকরে দেওবন্দ ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা-ঐতিহ্য সংরক্ষণকে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, এ ক্ষেত্রে শুধু আলেম-উলামা নয়, কওমি মাদ্রাসা, শিক্ষা বোর্ড, বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মুসলমানদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, বাতিল ফেরকা ও বিভ্রান্তিকর মতাদর্শ সম্পর্কে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে দরসে নিজামির মূল কাঠামো ও রুহ অক্ষুণ্ণ রেখে ইংরেজি ভাষা, প্রাথমিক তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান এবং সমসাময়িক বিষয়াবলির মতো যুগোপযোগী দক্ষতা সুচিন্তিতভাবে যুক্ত করা যেতে পারে।
যোগ্য শিক্ষক ও মুফতি তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের পাশাপাশি সনদ ও ইজাজতের মান অক্ষুণ্ণ রাখা এবং আধুনিক প্রচারমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সঠিক দাওয়াহ, গবেষণা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার হলে যথাযথ তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তা মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, দেওবন্দ-অনুসারী বিভিন্ন বোর্ড, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও ঐক্য জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আরবি-উর্দু ইলমি সাহিত্য মানসম্পন্ন বাংলায় অনুবাদ এবং বাংলা ভাষায় মৌলিক গবেষণা ও রচনাকর্মকে উৎসাহিত করতে হবে। নতুন প্রজন্মের আলেমদের গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোরও আহ্বান জানান তারা।
সাধারণ মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, দ্বীনি বিষয়ে সিদ্ধান্ত বা পরামর্শের ক্ষেত্রে যোগ্য ও সনদপ্রাপ্ত আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে। ইন্টারনেটে প্রচারিত অসত্যাপিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে উস্তাদ-শাগরিদের ঐতিহ্যবাহী ইলমি সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা সরকারের প্রতি শরিয়তবিরোধী জীবনস্বত্ব হেবা আইন বাতিল, সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের মতামত গ্রহণ এবং কুরআন-সুন্নাহসম্মত আইন ও নীতিমালা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।
বৈঠকে বক্তব্য দেন মাওলানা লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, মুফতি রেজাউল করিম আবরার, মুফতি জাবের কাসেমী, মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী, মুফতি হেমায়েত উল্লাহ, মুফতি শফিকুল ইসলাম, মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী, মুফতি ওমর ফারুক, মাওলানা আব্দুর রহমান কোববাদী, মুফতি সাঈদ আহমদ কলরব, মুফতি আবু যর, মুফতি ফয়সাল ওমর ও মুফতি ওমর ফারুক কাসেমী প্রমুখ।
প্রবন্ধ পাঠ করেন মাওলানা ইলিয়াস হোসাইন কাসেমী।