যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিভিন্ন পণ্যে কানাডার নতুন পাল্টা শুল্ক মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরোধ আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নতুন শুল্কের আওতায় রয়েছে পোশাক, পনির, ধাতব যন্ত্রাংশ, কাঠজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডা এই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শুল্কের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। কারণ শুল্কের আওতায় থাকা পণ্য দুই দেশের মোট বার্ষিক বাণিজ্যের একটি ছোট অংশ। তবে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরও বাড়তে থাকলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। কানাডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো শুল্ক আরোপ করলে তারাও প্রয়োজন অনুযায়ী পাল্টা ব্যবস্থা নেবেন।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা কানাডার অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর আরও শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এমনকি দুই দেশের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তিনি।
কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারের বিরুদ্ধেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে বোম্বার্ডিয়ারের নতুন বিমান বিক্রির সুযোগ বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের কানাডার কিছু পণ্য না কেনার আহ্বান জানান তিনি।
বোম্বার্ডিয়ার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানশিল্প তাদের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও যন্ত্রাংশ তৈরির কার্যক্রম রয়েছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিলের বাণিজ্য ও উদ্ভাবনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্র্যাড উড বলেন, দুই দেশের পাল্টাপাল্টি শুল্ক ব্যবসা ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই নেতিবাচক। এর ফলে সীমান্তপারের বাণিজ্যে অতিরিক্ত বাধা তৈরি হচ্ছে।
কানাডার সঙ্গে বিরোধের পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে এসব দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে ওয়াশিংটন।
এর আগে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু শুল্ক বাতিল করার পর বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নতুন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বেশি পণ্য রপ্তানি করে কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম মার্কিন পণ্য আমদানি করে, তাদের সঙ্গেও কঠোর বাণিজ্যনীতি গ্রহণের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুল্ক বৃদ্ধির কারণে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। চলতি সপ্তাহেই দেশটির নতুন ভোক্তা মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রকাশের কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার বাণিজ্য বিরোধ চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশ্যে আরও তীব্র হয়। সে সময় ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে মার্কিন শিল্পের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ এনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমঝোতা না হলে কানাডার কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলার পর আগস্টে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র কানাডার ওয়াইন, পনির, পোশাক, হকি স্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক আরোপ করে। জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকরের ঘোষণা দেয়।
এরপর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। ট্রাম্প কানাডার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করার পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রেখেছেন।
কানাডার মুদ্রার বিনিময় হার নিয়েও সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। মার্কিন ডলারের বিপরীতে কানাডীয় ডলারের বর্তমান অবস্থান নিয়ে তিনি সমালোচনা করে এটিকে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন।