খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধে নিয়মিত এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। তিনি জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ২১০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অনিরাপদ ও অনিবন্ধিত শিশুখাদ্য নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানসিলা জেবরিনের কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধির নোটিশের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
আফরোজা খানম রিতা বলেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাঠপর্যায়ের ৭২টি কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে ১৪৪টি খাদ্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দই, গুঁড়া মসলা, শিশুখাদ্য ও বেকারি পণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের নমুনা সরকারি অনুমোদিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বোতলজাত পানির ১৪৯টি নমুনায় ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, আয়রন ও লেডের মতো উপাদান পরীক্ষা করা হয়েছে। ভোজ্যতেলের ৫৪টি নমুনায় ট্রান্সফ্যাট, আয়োডিন ভ্যালু ও স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালু যাচাই করা হয়।
এ ছাড়া ৩৩টি দুধের নমুনায় মিল্ক ফ্যাট, মিল্ক প্রোটিন, লেড ও মেলামাইন এবং তিনটি দইয়ের নমুনায় মিল্ক ফ্যাট, মিল্ক প্রোটিন ও সোডিয়াম সাইক্লামেট পরীক্ষা করা হয়েছে।
শিশুখাদ্যের পাঁচটি নমুনায় লেড এবং ৭৯টি মসলা পণ্যের নমুনায় লেড, ক্রোমেট ও সুদান ডাইয়ের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ১৫৭টি বেকারি পণ্যে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ও পটাশিয়াম ব্রোমেট পরীক্ষা করা হয়েছে।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ৭২টি কার্যালয়ে মিনি ল্যাবরেটরি রয়েছে। এর পাশাপাশি আটটি মোবাইল ল্যাবরেটরি এবং সরকারি-বেসরকারি ৪৭টি অনুমোদিত পরীক্ষাগারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকায় একটি রেফারেন্স ল্যাবরেটরি এবং খুলনা ও চট্টগ্রামে দুটি বিভাগীয় ল্যাবরেটরি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পরীক্ষায় কোনো খাদ্যপণ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানান খাদ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষিত খাদ্যপণ্যের তালিকা ও পরীক্ষার ফলাফল নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের নাম, ব্র্যান্ড, ব্যাচ নম্বর ও পরীক্ষার ফলাফল উল্লেখ করে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার তদারকি, নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কার্যক্রম চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগস্ট পর্যন্ত ১৭টি জেলায় শিশুখাদ্য নিয়ে মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭৫৬টি খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও মনিটরিং করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও সংসদকে জানান তিনি।
বর্তমানে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য বিক্রির বিষয়টিও নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনিরাপদ বা অনিবন্ধিত খাদ্যপণ্য বিক্রির বিষয়েও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সানসিলা জেবরিনের প্রস্তাবের প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত বিভিন্ন কার্যক্রমের অনেকগুলোই ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, খাদ্য নিরাপত্তা একটি সমন্বিত বিষয়। এ কারণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বিএসটিআই ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো একসঙ্গে মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করছে।
ভবিষ্যতে ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে নজরদারি আরও জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
খাদ্যদূষণ, মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ নতুন ধরনের খাদ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও সংসদে জানান খাদ্যমন্ত্রী।