ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হওয়া নাজুক সমঝোতা বাস্তবায়ন নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারমাণবিক পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরান এই দাবি অস্বীকার করেছে। ইরান বলেছে, আলোচনায় তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের ফেরানোর বিষয়েও তারা সম্মতি দেয়নি।
রয়টার্স জানায়, সোমবার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফা আলোচনা শেষ হয়। এরপর দুই পক্ষই সমঝোতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। পারমাণবিক পরিদর্শন, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ট্রাম্প পেনসিলভানিয়ায় এক সমাবেশে বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজন হলে তিনি যা করার তা করবেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিশ্বকাপ ফুটবল দলের ওপর ভ্রমণসংক্রান্ত বিধিনিষেধও কিছুটা শিথিল করেছে।
সমঝোতা অনুযায়ী, ইরানকে ৬০ দিনের জন্য তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রি এবং তার অর্থ গ্রহণের সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা ছাড় দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, তা নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন।
ট্রাম্পের দাবি, ছাড় পাওয়া অর্থ খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি আলী বাহরেইনি বলেছেন, ওই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে সিদ্ধান্ত ইরান নিজেই নেবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও আলোচনা চলছে। সমঝোতায় বলা হয়েছে, ইরান ৬০ দিন ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল অবাধ রাখবে। তবে পরবর্তীতে জাহাজ চলাচলে ফি বা অন্য কোনো চার্জ আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। ওমান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য তারা আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অস্থায়ী করিডোরের ব্যবস্থা করছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে কোনো টোল আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক আমেরিকান মনে করছেন যুদ্ধের পর ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন সিনেট যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে একটি প্রস্তাবও পাস করেছে, যদিও সেটি মূলত প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অবস্থানও সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে আছে। ইরান বলছে, চুক্তি বাস্তবায়নে ইসরাইলকে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। তবে ইসরাইল জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখবে এবং নিজেদের নাগরিক ও সেনাদের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যে আলোচনার দরজা খুলে দিলেও পারমাণবিক পরিদর্শন, অর্থ ছাড় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মতপার্থক্য দূর না হলে সমঝোতার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থেকে যাবে।
সূত্র: রয়টার্স