যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল কানাডা। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যায় দক্ষিণের প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রে। তারপরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অটোয়ার হাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি অঙ্গরাজ্যের পণ্যের সবচেয়ে বড় বিদেশি ক্রেতা কানাডা। আবার ৫০ অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৫টির ক্ষেত্রেই কানাডা শীর্ষ তিন রপ্তানি বাজারের একটি। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক নির্ভরতা একমুখী নয়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছেন। ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষিযন্ত্র, ইলেকট্রনিকস, পাল্প ও কাগজশিল্পের বিভিন্ন মার্কিন পণ্য এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
কানাডার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি জ্বালানি। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ আসে কানাডা থেকে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতেরও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশটি।
কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই চাইবে না কানাডা এসব জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিক। যদিও বর্তমান পাল্টা ব্যবস্থায় জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, ভবিষ্যতে এই খাতকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি।
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত চার্জ আরোপের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ২০২৫ সালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অন্টারিও সরকারের হিসাবে, এমন পদক্ষেপ মিশিগান, মিনেসোটা ও নিউইয়র্কের প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করতে পারে।
জ্বালানির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রেও শক্ত অবস্থানে রয়েছে কানাডা। সার উৎপাদনে ব্যবহৃত পটাশের বিশ্বের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী দেশটি। এছাড়া লিথিয়াম, নিকেল ও গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজেরও উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে কানাডায়। এসব খনিজের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র।
কানাডার আরেকটি বড় শক্তি দেশটির ভোক্তাবাজার। আগের দফার বাণিজ্য বিরোধের সময় কানাডার বেশ কয়েকটি প্রদেশের দোকান থেকে মার্কিন মদ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর প্রভাবে কানাডায় মার্কিন ওয়াইন রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যায়।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমিয়ে দিয়েছিলেন অনেক কানাডীয়। ফলে মার্কিন পর্যটননির্ভর শহর ও অঙ্গরাজ্যগুলোও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে কানাডীয় পর্যটকদের ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গন্তব্যে বিশেষ প্রচার চালানো হয়।
তবে বাণিজ্যযুদ্ধ কানাডার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর দেশটির উচ্চ নির্ভরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি পাল্টাপাল্টি শুল্ক কানাডার প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং শিল্প খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তারপরও জনমত আপাতত কার্নি সরকারের কঠোর অবস্থানের পক্ষে রয়েছে। অ্যাঙ্গাস রিডের একটি জরিপে প্রায় ৭৬ শতাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় অটোয়ার কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। মিশিগান ও মেইনের মতো সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতির সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য গভীরভাবে যুক্ত। পাল্টা শুল্কের কারণে এসব অঙ্গরাজ্যে পণ্যের দাম ও ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়লে তার রাজনৈতিক প্রভাবও পড়তে পারে।
কার্নির বক্তব্য, কানাডার গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক বাড়ালে শুধু কানাডীয় নয়, মিশিগান, ওহাইও, কেন্টাকি ও আলাবামার মতো অঙ্গরাজ্যের মার্কিন শ্রমিকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কানাডার অর্থনীতি ছোট এবং মার্কিন বাজারের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হলেও অটোয়ার হাতে পাল্টা চাপ দেওয়ার সুযোগ একেবারে কম নয়। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বিশাল ক্রয়ক্ষমতা এবং সীমান্তবর্তী মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক নির্ভরতা এখন কার্নি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বাসস
মন্তব্যসমূহ