সচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও এতে প্রাণহানির সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ভবনে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি চিকিৎসাসেবা ও মহাসড়কে টহল কার্যক্রমের জন্য ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স, ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স এবং ৮০টি হাইওয়ে প্যাট্রোল মোটরসাইকেল উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। দুর্ঘটনা কমানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত নতুন নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের পাশে থাকা বাজারগুলো স্থানান্তর, আঞ্চলিক সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে ডাইভারশন নির্মাণ এবং সড়কে স্পষ্ট মার্কিং ও সাইনেজ স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, হেলমেট না পরা এবং পথচারীদের অসচেতনতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
চালকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অনেক চালক পরিবহন খাতে সহকারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ি চালানো শেখেন। তবে গাড়ি চালাতে পারা আর দক্ষ চালক হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মহাসড়কে নিরাপদ ও নিয়ম মেনে গাড়ি চালানোর জন্য চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় চালকদের প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে উদ্বোধন করা অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান মন্ত্রী। মহাসড়কের পাশে থাকা হাসপাতালগুলোতে পৃথক ইউনিট চালু এবং প্রতি ১০ কিলোমিটার অন্তর একটি করে অ্যাম্বুলেন্স রাখার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ট্রমা সেন্টারগুলো পুনরায় কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান শেখ রবিউল আলম। তার মতে, আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তা ও সরকারের অর্থায়ন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জনগণের অর্থ এমন কোনো প্রকল্পে ব্যয় করা যাবে না, যার সুফল জনগণ পাবে না। প্রকল্পের প্রতিটি অর্থ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার কাজে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, জনগণকে সচেতন করাও জরুরি। সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে সব উদ্যোগই ব্যর্থ হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুর্ঘটনার পর দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পটি দেশের প্রথম বহুখাতভিত্তিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’নির্ভর উদ্যোগ। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, বিআরটিএ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের আওতায় ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স জয়দেবপুর-হাটিকামরুল-বগুড়া-রংপুর, হাটিকামরুল-নাটোর-রাজশাহী এবং জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়কে প্রতি ১০ কিলোমিটার অন্তর মোতায়েন করা হবে।
অনুষ্ঠানে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্যসমূহ