বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের সময়কাল ১০ বছর থেকে আরও দীর্ঘায়িত না হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের শুধু মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ, মর্যাদা, নিজস্ব ঘর এবং শান্তিপূর্ণভাবে মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘রোহিঙ্গা সংকটের ১০ বছরে: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে, তবে এই সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব এককভাবে বাংলাদেশের ওপর চাপানো উচিত নয়। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তার মতে, রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক সমস্যা নয়, এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ও জড়িত। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের এই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হলেও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের পথ খোলা রাখতে চায়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষা মৌলিক প্রয়োজন। এসব খাতে অর্থায়ন কমে গেলে শুধু শরণার্থীরাই নয়, আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী এবং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ আন্তর্জাতিক দাতা ও অংশীদারদের সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্বে একাধিক সংকট থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা রোহিঙ্গা সংকটের গুরুত্ব কোনোভাবেই কমে যায়নি।
কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপের কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্থানীয়রা তাদের ভূমি ও সম্পদ ভাগ করে নিয়েছেন, জীবিকা ও পরিবেশে প্রভাব সহ্য করেছেন। তাই রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্যও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে মানবিক সহায়তাকে সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও মিয়ানমারের ভেতরেই নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন। শরণার্থী শিবির কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী আবাসের বিকল্প হতে পারে না।
প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেন শামা ওবায়েদ। বিশেষ করে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আসা ব্যক্তিদের তথ্য যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
তার মতে, সঠিক তথ্য ও গ্রহণযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ, জাতিসংঘ, আঞ্চলিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, এক দশক আগে বাংলাদেশ একটি জরুরি মানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। এখন সেই সংকট দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এ সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং এ বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, ঢাকায় চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউয়িন এবং আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশন ড. লরা টম্ব বন্ডেসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।
মন্তব্যসমূহ