নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতারা তাকে আবার দলের নেতৃত্বে ফিরিয়ে এনে তার সভাপতিত্বেই ১৫তম সাধারণ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে দলের অন্য একটি অংশ এই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে।
নেপালের সুপ্রিম কোর্ট আগের একটি রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করার পর দেউবা-সমর্থকরা নতুন এই প্রস্তাব সামনে আনেন। এর আগে ১৭ এপ্রিলের রায়ে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল আদালত।
দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের সামনে দুটি বিকল্প রয়েছে। একটি হলো সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা। অন্যটি হলো ১৪তম সাধারণ সম্মেলনে নির্বাচিত দেউবার নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটিকে গ্রহণ করে তার নেতৃত্বেই ১৫তম সাধারণ সম্মেলনের আয়োজন করা।
দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতা প্রকাশ শরণ মহাত বলেন, আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করা অথবা ১৪তম সাধারণ সম্মেলনে দেউবার নেতৃত্বে নির্বাচিত কমিটিকে স্বীকৃতি দিয়ে পরবর্তী সাধারণ সম্মেলনের দিকে এগিয়ে যাওয়া—দুটি পথই খোলা রয়েছে।
তার মতে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ১৫তম সাধারণ সম্মেলন দেউবার নেতৃত্বেই হওয়া উচিত। বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকে তিনি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
মহাত আরও বলেন, আদালত যেহেতু আগের রায় পুনর্বিবেচনার অনুমতি দিয়েছে, তাই দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ সম্মেলনের বিষয়ে দলীয় পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা না করেও ঐক্য ফেরানো সম্ভব।
দেউবার নেতৃত্বে দলের বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে একত্র করা তুলনামূলক সহজ হবে বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেউবার নেতৃত্বে সবাইকে একসঙ্গে আনা সম্ভব এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা কোনো পক্ষকে কোণঠাসা করার প্রয়োজন হবে না।
প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নেপালে ফিরেছেন শের বাহাদুর দেউবা। পাঁচবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দুই মেয়াদে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি দেউবা দেশে ফিরে সরাসরি কাঠমান্ডুর চুন্ডেভিতে তার সমর্থকদের যোগাযোগ কার্যালয়ে যান।
সেখানে আগে থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের অনুরোধে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন দেউবা। এ সময় তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
দেউবা বলেন, রাজতান্ত্রিক পঞ্চায়েত আমল, রাজা জ্ঞানেন্দ্রর সরাসরি শাসন এবং বর্তমান সরকারের সময়ও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজা জ্ঞানেন্দ্র যেখানে তা করতে পারেননি, সেখানে অন্য কেউ কীভাবে তা করতে পারবেন।
দেশে ফেরার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেউবা নেপালি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ দূর করার আহ্বান জানান। তার মতে, দেশের প্রধান গণতান্ত্রিক দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি জাতীয় ঐক্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের নেপালি কংগ্রেসের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাসকে সম্মান করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তরুণ নেতাদের দলের রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন দেউবা। তবে অভিজ্ঞ নেতাদের অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে দলীয় দায়িত্ব নির্ধারণের প্রবণতার বিরোধিতা করেন তিনি।
নেপালি কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্ব সংকটের শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। দলের ৪০ শতাংশের বেশি প্রতিনিধি ওই সম্মেলনের দাবি জানিয়েছিলেন। পরে সম্মেলনে গগন থাপাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
এরপর নির্বাচন কমিশন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে স্বীকৃতি দিলে দেউবা শিবির সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায়।
১৭ এপ্রিল আদালতের একটি বেঞ্চ থাপার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে দলের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তও বহাল রাখা হয়। পরে দেউবা শিবির ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে।
প্রাথমিক পর্যালোচনার পর ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি নথিভুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে আদালত পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ায় নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে আইনি বিরোধ আবারও সামনে এসেছে।
দলের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ পৌডেল দেউবাকে আবার সভাপতি করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের মাধ্যমে যে নেতৃত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে, তাকে আবার সভাপতি হিসেবে ফিরিয়ে এনে সাধারণ সম্মেলন আয়োজন করা আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
পৌডেল বলেন, দেউবা এরই মধ্যে দুই মেয়াদে দলের সভাপতি ছিলেন। এখন তার উচিত দলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে বৃহত্তর ঐক্যের জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা।
এদিকে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের শুরুতে দেউবার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানান গগন থাপা। চিকিৎসার জন্য বিদেশে থাকা সাবেক সভাপতি সুস্থ হয়ে দেশে ফেরায় তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর কথা বলেন তিনি।
নেতৃত্বের বিরোধের পাশাপাশি দেউবার বিরুদ্ধে চলমান আইনি তদন্তও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিদেশে অবস্থানের সময় দেশটির অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে তদন্ত শুরু করে।
দেউবা ও তার স্ত্রী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধে কাঠমান্ডু জেলা আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তবে ২৫ মে সুপ্রিম কোর্ট তাদের গ্রেপ্তার না করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। আদালত ওই পরোয়ানার আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
এদিকে ইন্টারপোলও দেউবা দম্পতির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে রাজি হয়নি। তবে অর্থপাচারের তদন্ত এখনো চলছে। জুলাইয়ে তদন্তকারীরা বিশেষ আদালতে একটি অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে দেউবার ছেলে জয়বীর দেউবার মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালি রুপির একটি লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
দেউবার ব্যক্তিগত সচিব ভানু দেউবা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর এই তদন্তের বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নেবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।
সূত্র : দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট
মন্তব্যসমূহ