রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া দেশে কোনোভাবেই মাদক কারবার পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান, পরিবহন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিপণনের প্রতিটি ধাপে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে; এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যও এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘মাদককে না বলি, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি’ স্লোগানে এই সেমিনারের আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি। এতে সহযোগিতা করে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ডিবেটিং সোসাইটি এবং ইডেন মহিলা কলেজ ডিবেটিং ক্লাব।
ইশরাক হোসেন বলেন, ‘জনগণ রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্র পরিচালনার আমানত দেন। সেই পবিত্র দায়িত্বে থেকে কেউ যদি মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হন, তবে তাঁর রাজনীতি করার কোনো নৈতিক অধিকার থাকে না। মাদক একটি সমাজ ও পুরো জাতিকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধ।’ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি জাতীয় গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি জানান, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ অবৈধ মাদক ব্যবহারকারী রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। তাদের একটি বড় অংশই ২৫ বছর বয়সের আগে মাদকাসক্ত হচ্ছেন।
নিজ নির্বাচনী এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুন্টিঘর এলাকায় একসময় প্রকাশ্য মাদকের হাট বসত। তরুণ-তরুণীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাচীর টপকে ভেতরে গিয়ে মাদক সেবন করত। সিসিটিভি ফুটেজে এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে ঢাকা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিন ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে জুরাইন রেলগেট থেকে ঘুন্টিঘর পর্যন্ত সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয় এবং এলাকাটিকে নিরাপদ করতে নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাদকের সরবরাহব্যবস্থা (Supply Chain) ভেঙে দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, তাঁর অনুসন্ধানে বেশ কয়েকটি নামিদামি দূরপাল্লার পরিবহন কোম্পানির বাসে মাদক পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া ঢাকার কিছু অভিজাত এলাকায় মেথামফেটামিন (আইস) তৈরির গোপন ল্যাব এবং কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির কাঁচামাল পাচারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তিনি এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি ছিন্নমূল ও ঠিকানাহীন মাদকসেবীদের জন্য রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান, কারণ অর্থের অভাবে এরা ছিনতাই, চুরি ও সহিংস অপরাধে জড়াচ্ছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। তিনি বলেন, মাদক এখন শুধু নগরীতে সীমাবদ্ধ নেই, প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অনলাইন অর্ডারেও হোম ডেলিভারি মিলছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মাদক কারবারিরা গিরগিটির মতো রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নিরাপদে থাকে। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, অভিযানে বাহক ও সেবীরা আটক হলেও গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ, খ্যাতনামা মনোচিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এম এ মোহিত কামাল, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী, স্টেট ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি মো. মুন্না হুসাইন এবং ইডেন কলেজের দলনেতা মাসনুন নাবিলা আলম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাবেক জাতীয় বিতার্কিক মো. কাউসার আলম।














মন্তব্যসমূহ