ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন

এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন
ছবি: সংগৃহীত
ফলো করুন

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত, ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে দলের রাজনৈতিক কৌশল, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়া এবং দলীয় কাঠামোয় গণতন্ত্রের ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের কথা তুলে ধরে তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত এক দীর্ঘ বিবৃতিতে নিজের পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেন সামান্তা। সেখানে তিনি লেখেন, ‘কিছুক্ষণ আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আমি পদত্যাগ করেছি।’

বিবৃতির শুরুতে সামান্তা জানান, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি দলের প্রচলিত অবস্থানের বাইরে গিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত—কোনো বিবেচনাতেই এনসিপির মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়। দলটির সঙ্গে জোটে যাওয়ার জন্য এনসিপিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি তখন সতর্ক করেছিলেন।

তিনি জানান, গত ১১ মাসে এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। সুযোগ পেলেই আলোচনা, বিতর্ক ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে দলের সিদ্ধান্তগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ভুল পথে পরিচালিত হলে সেই অবস্থান থেকে দলকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা একজন সদস্যের রাজনৈতিক দায়িত্ব। সে কারণেই তিনি দলের স্বীকৃত ফোরামগুলোতে যুক্তির মাধ্যমে মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে গেছেন।

তবে প্রায় এক বছরের সেই প্রচেষ্টার পর তিনি মনে করছেন, এনসিপির পক্ষে প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকা সম্ভব নয়। পদত্যাগের জন্য আরও উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা না করার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, দলের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাঁর পদত্যাগকে মূল্যায়ন করা সহজ হতে পারত। কিন্তু এনসিপি কখনো জামায়াতের সঙ্গে জোট ত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নিলেও পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি তৈরি করতে পারবে বলে তাঁর বিশ্বাস নেই।

সামান্তার ভাষায়, পুরোনো ব্যবস্থার রাজনৈতিক দল দিয়ে রাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; বরং এ ধরনের দল নতুন ব্যবস্থা গঠনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে দলের ভেতরে এত দিন ধরে চলা মতপার্থক্য ও আলোচনার বিষয়গুলো দলের সদস্যদের পাশাপাশি বাইরের শুভানুধ্যায়ীদের কাছেও তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করেছেন তিনি।

জামায়াত কি সংস্কারের রাজনৈতিক মিত্র হতে পারে

সামান্তার বিবৃতির প্রথম বড় আলোচ্য বিষয় ছিল জামায়াতে ইসলামীকে সংস্কারের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য তিনটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন জরুরি ছিল বলে তিনি মনে করেন।

এগুলো হলো—সংবিধানে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের ভিত্তি পরিবর্তনের লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংস্কার, রাষ্ট্র পরিচালনার আইন-কানুন গণবিরোধী অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী করার জন্য আইনি সংস্কার এবং পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার।

তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই তিনটি সংস্কারের কোনোটিকেই নিজেদের দলীয় রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে না। তাঁর মতে, দলটি প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। জামায়াতকে সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে দেখা গেলেও তা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজন থেকে করা হয়।

সামান্তার মতে, গণতান্ত্রিক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয় উদার গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধ থেকে। অন্যদিকে জামায়াত শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধী নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ কারণেই দলটির রাজনীতির মৌলিক ভিত্তিতে পরিবর্তন আসেনি বলে তাঁর দাবি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে জামায়াত গণহত্যাকেও বৈধ মনে করে। ১৯৭১ সালে দলটির ভূমিকার জন্য অপরাধ স্বীকার না করা এবং জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়াকে তিনি সংগঠনটির রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সামান্তার বক্তব্য অনুযায়ী, এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেছে, তখন উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের একটি অংশ সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর মতে, এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না থাকায় দলটি জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহযোগী ভূমিকা নিতে হচ্ছে এনসিপিকে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া দল হিসেবে এই পরিস্থিতি থেকে এনসিপিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা তিনি বারবার করেছেন বলেও জানান।

২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে এনসিপির কৌশলের সমালোচনা

বিবৃতির দ্বিতীয় প্রসঙ্গে সামান্তা ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন না হয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপলক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ ও ১৯৯০ সালের নির্বাচনগুলো কেবল ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সেগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথও তৈরি করেছিল।

কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনকে গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরিয়ে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচনে পরিণত করার চেষ্টা করেছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সামান্তার মতে, ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ব্যর্থ হওয়ার পরও এনসিপির সামনে রাজনৈতিকভাবে পুরোনো ব্যবস্থার মোকাবিলা করতে আগ্রহী শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সুযোগ ছিল। প্রয়োজনে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েও দলটি একটি রাজনৈতিক নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিতে পারত। তাঁর ধারণা, এমন কৌশল গ্রহণ করলে এনসিপি নির্বাচনে বর্তমান ফলাফলের চেয়েও ভালো ফল করতে পারত।

তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক নির্বাচনের ফলাফল কেবল দলীয় ক্ষমতা বা সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাসের আগের রাজনৈতিক নির্বাচনগুলোও সে শিক্ষা দেয়। কিন্তু এনসিপি সেই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের সহযোগী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এর ফলে দলটির নিজস্ব রাজনীতি এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক ধারার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সামান্তা আরও জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও নির্বাচনের বর্তমান ফলাফলের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির পাঁচটি পদ্ধতির কথা তিনি দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু নেতৃত্ব সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিজয়ের পরিবর্তে নির্বাচনী বিজয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে সংস্কারবিহীন ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানোর গ্রহণযোগ্যতাও এনসিপি হারিয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি শহীদ ওসমান হাদির নির্বাচনী প্রচারণার উদাহরণ দেন। সামান্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে ন্যূনতম ৫০০ ভোট পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে ওসমান হাদি সম্পূর্ণ এককভাবে ভিন্ন ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ জামায়াতের সঙ্গে জোট করার মতো পুরোনো ও অগণতান্ত্রিক নির্বাচনী কৌশলের পক্ষে যুক্তি দেখাতে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে ব্যবহার করা হয়েছে। সামান্তা এ যুক্তিকে অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন।

গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক অধিকার

বিবৃতির তৃতীয় অংশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ, তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার এবং এনসিপির সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সামান্তা।

তিনি বলেন, আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন—এমন আন্দোলন পরাজিত হয়নি। বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম নেই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আন্দোলনে নারীরা শুধু অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও আন্দোলনকারীদের রক্ষাকারী।

সামান্তার মতে, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং বৈষম্য-নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান থেকেই নারীরা গণঅভ্যুত্থানে যুক্ত হয়েছিলেন। ব্যারিকেডের সামনে তাঁদের অবস্থান, সাহস ও সক্রিয়তা আন্দোলনকে সর্বজনীন রূপ দিয়েছিল।

কিন্তু আন্দোলনের বিজয়ের পর পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলো নারীদের সেই অর্জিত অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনের সময় যেসব সামাজিক অনুশাসন ও প্রতিবন্ধকতা নারীদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে পারেনি, বিজয়ের পর সেগুলোকেই তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে দুর্বল করে আগের মতো নারীবিহীন রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে।

সামান্তার মতে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। কিন্তু শুধু দলে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। দলের সদস্যসংখ্যা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। তাঁর অভিযোগ, এনসিপি সেই পথ অনুসরণ করেনি; বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়েছে।

তিনি বলেন, এর ফলে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, এনসিপি তা ধারণ করতে পারেনি। পুরোনো দলগুলোর মতোই নারীদের কোণঠাসা করা হয়েছে, তাঁদের প্রতিবাদ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী উল্লেখ করে সামান্তা বলেন, নারীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে শুধু দলের নারী সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া নয়; বরং দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা।

বাংলাদেশের মতো সমাজে নারীদের এগিয়ে নিতে ইতিবাচক বৈষম্য বা পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও অনেক সময় যথেষ্ট হয় না। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো নারীদের পিছিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই ব্যবধান দূর করতে শুধু সমান সুযোগ নয়, নারীদের অধিক প্রতিনিধিত্ব, অধিক ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এত কিছুর পরও প্রতিষ্ঠিত বৈষম্যের পুরো ব্যবধান দূর করা কঠিন হতে পারত বলে মনে করেন তিনি।

নারীদের রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সামান্তা। তাঁর দাবি, এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব শক্তির রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দলের সাংগঠনিক কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও নারীবিরোধী অবস্থান জায়গা করে নিয়েছে।

আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার গুরুত্ব বোঝাতে সামান্তা পুরুষ ও নারীর রক্ষাকারী ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একজন পুরুষ যখন অন্য পুরুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড়ান, তখন তার প্রভাব এক ধরনের হয়। কিন্তু একজন নারী যখন পুরুষের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন, তখন তা প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতাসম্পর্ক ও সামাজিক প্রত্যাশাকে আরও গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে সুরক্ষিত করেছিলেন। অথচ বিজয়ের পর তাঁদের মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি একটি প্রশ্ন সামনে আনেন—আন্দোলনের সময় মিছিলের সামনে নারীদের এগিয়ে রাখা কি তাঁদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি ছিল, নাকি বিপদের মুখে তাঁদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহারের কৌশল ছিল? তাঁর মতে, আন্দোলনের প্রয়োজনে নারীদের সাহস ও ত্যাগ গ্রহণ করা হলেও বিজয়ের পর তাঁদের ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হলে তাঁদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি থাকে না।

সামান্তার বক্তব্য, বৈষম্য, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার বহন করার দাবি করা কোনো দল নিজের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে বৈষম্যমূলক ক্ষমতাসম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। কারণ নারীরা শুধু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেননি, আন্দোলনের চরিত্র নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছেন। যে রাজনৈতিক শক্তি বিজয়ের জন্য নারীদের সাহস ও প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু বিজয়ের পর তাঁদের সমান মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে, তাকে প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী বলা যায় না বলে মনে করেন তিনি।

কাউন্সিল ছাড়াই এনসিপির পুনর্গঠনের সমালোচনা

বিবৃতির চতুর্থ প্রসঙ্গে সামান্তা এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো, কাউন্সিল আয়োজন না করা এবং আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা করেছিল, যার কাঠামো প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আলাদা হবে। এই ভিন্নতা শুধু নেতৃত্ব, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল না। দলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়েও তা প্রকাশ পাওয়ার প্রয়োজন ছিল।

সামান্তা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এসব দলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, পরিবারতন্ত্র, পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব, আর্থিক অস্বচ্ছতা, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা, ভিন্নমত দমন এবং নেতৃত্বের জবাবদিহির অভাব রয়েছে। এসব কারণে সাধারণ কর্মীদের দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। একই সঙ্গে নেতৃত্ব পরিবর্তন ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়।

তাঁর মতে, পুরোনো ধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে কাউন্সিল পিছিয়ে দেওয়া কিংবা আয়োজন না করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সময়মতো কাউন্সিল না হলে নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এতে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অল্প কয়েকজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই কাউন্সিলকে তিনি কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং গণতান্ত্রিক চর্চা ও সাংগঠনিক জবাবদিহির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।

সামান্তার অভিযোগ, কাউন্সিল আয়োজন না করে আবারও আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন বা রিস্ট্রাকচার করার মধ্য দিয়ে এনসিপি দলের ভেতরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে দলটি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই বিরোধী মত দমনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর আরও অভিযোগ, নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার বিষয়ে নেতৃত্বের উদাসীনতা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এনসিপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনআস্থা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।

সামান্তার মতে, যে দল নিজের ভেতরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।

দলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড পুনর্বিবেচনার জন্য বারবার আহ্বান জানানোর পরও এনসিপি অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহী না হওয়ায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অভিমুখও বিবৃতিতে তুলে ধরেন।

বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান

পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যার পর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন সামান্তা। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশকে নানা ধরনের বিভাজনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করা, যা মানুষকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাবে না। বরং ভিন্নমত, বিশ্বাস ও পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সবাইকে একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করবে।

সামান্তার মতে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপির সামনে এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল। দলটিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি তৈরি হবে। কিন্তু সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সেই সম্ভাবনা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তবে কোনো দল বা কয়েকজন নেতার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়া মানেই মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু নয় কিংবা সেই প্রয়োজন শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে এখনো এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন রয়েছে, যার লক্ষ্য হবে মানুষকে বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ করা। এই ঐক্যের ভিত্তি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা একক রাজনৈতিক বিশ্বাস হতে পারে না। বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন অঙ্গীকারই হতে হবে এর মূল ভিত্তি।

এ ধরনের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে নেতৃত্বের চিন্তার কেন্দ্রে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থকে রাখতে হবে বলে মনে করেন সামান্তা। তাঁর মতে, নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও কোনো একটি দেশের প্রতি অন্ধ সমর্থন কিংবা বিরোধিতার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে ফেলা—কোনোটিই স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না।

সামান্তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হতে হবে দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কিংবা বিরাগের ভিত্তিতে নয়। ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হলে যেমন তার বিরোধিতা করতে হবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। এক দেশের ক্ষেত্রে আপসহীন থাকা এবং অন্য দেশের ক্ষেত্রে নীরবতা বজায় রাখাকে তিনি দ্বৈত মানদণ্ড হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির অর্থ হলো বন্ধু কিংবা প্রতিপক্ষ—সব দেশের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।

নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন রাজনৈতিক শক্তির সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন সামান্তা। তাঁর মতে, নারীদের অংশগ্রহণকে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁদের স্বাধীন অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সমান নাগরিক অধিকার রাজনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও জাতীয় পুঁজির বিকাশ ও সুরক্ষা, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং দেশের সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে জনগণের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সামান্তার ভাষ্য, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ শুধু বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা করা নয়। দেশের ভেতরে যেসব ক্ষমতাকাঠামো ও স্বার্থ জনগণের অধিকার এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমিত করে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হবে।

তিনি বলেন, তরুণদের প্রতি মানুষের সমর্থনের পেছনে প্রত্যাশা ছিল—তাঁরা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবেন না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবেন। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের মতো বিষয়গুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশের তরুণদের সামনে নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন সামান্তা। তাঁর মতে, কাজটি শুধু নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এমন একটি ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজন রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে না। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্য যেন তা আড়াল করতে না পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় থাকলেও বাংলাদেশের স্বার্থের ওপরে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকতে পারবে না।

তরুণ সমাজকে আবার সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন উদ্যোগ যেন অতীতের কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরাবৃত্তি না হয়। বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য নতুন প্রচেষ্টা হতে হবে।

বিবৃতির শেষ অংশে সামান্তা লেখেন, ‘আমি এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, কাজ করতে অংগীকারাবদ্ধ যারা আমার সাথে এবিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সকলকে আহবান করছি, যোগাযোগ করুন। আমি আপনাদেরকে সাথে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।’

ট্যাগ : এনসিপি সামান্তা শারমিন

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

আরও পড়ুন

রাজনীতি

কথা

এতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কথা বলার সময় আমি সবসময় 'ইনশাআল্লাহ' বলতাম। কিন্তু আজ, এই রাতে আমরা সেই 'ইনশাআল্লাহ'কে …

আবদুল এল-সাইয়েদযুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সেনেটর

মাদরাসাগুলোতে জঘন্য অনাচারের যত ঘটনা শোনা যায়, তার অধিকাংশই ভুঁইফোঁড়, মানহীন প্রাইভেট মাদরাসা।

শায়খ আহমাদুল্লাহইসলামিক স্কলার

আজ সারা দেশে যে জেন-জি আন্দোলন দেখছি, তার সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশে। আমাদের পথ দেখানো এবং তরুণদের প্রতি সংহতি ও সমর্থনের জন্য আপনাদের (বাংলাদেশিদের) অভিন…

নেহা বোরাপ্রেসিডেন্ট, অল ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন

প্রিয় চাঁদাবাজ ভাইয়েরা, আমাদের জানটার নিরাপত্তা দেন। আমরা আপনাদের নিয়মিত ভিক্ষা দেব, তবুও বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নষ্ট করবেন না। বাংলাদেশের প্রতিটি মো…

হাসনাত আবদুল্লাহসংসদ সদস্য, কুমিল্লা-৪

মিরপুরের টিকাকেন্দ্র-হাসপাতালের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্নির্মাণ এবং ইসিবি চত্বরের স্টুডিও হামলার ক্ষতিপূরণ সরকারকে দিতে হবে। মূল হোতাসহ জড়িত সবাইকে দ্রুত আইন…

আসিফ মাহমুদমুখপাত্র, এনসিপি

নাজিম উদ্দীনের সম্পদ মনে করে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভেঙেছে। এটা অনাকাঙিক্ষত।

রাশেদ খানপ্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী

গা'জা যু'দ্ধে হাজার হাজার শিশুসহ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় মানবিক সহায়তা ছিল অত্যন্ত সীমিত। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে…

খলিলুর রহমানসভাপতি, সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘ

আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ থেকে বাদ দিতে হলে সংস্কার দরকার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহ'ত্যার বিচার-এই তিনটা দাবি মানলেই কক'টেল আর ফুটবে না ঢাকা শহরে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীমুখ্য সমন্বয়ক, এনসিপি
সব কথা

সংবাদ সংক্ষেপ

০১/০৩

নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত দাবি

দেশের নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে উদ্বেগ জানিয়েছে ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্স (এনএসএ)। দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ৬৭ জন সাবেক ও বর্তমান নারী ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকারে এসব অভিযোগ উঠে আসে।

এক নজরে পুরো খবর
০২/০৩

আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি ২ লাখ ২৪ হাজার ছাড়াল

দুই দিনের ব্যবধানে আবারও স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা বেড়ে নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা। পাকা স্বর্ণের দাম বাড়ায় এই সমন্বয়; বুধবার দুপুর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।

এক নজরে পুরো খবর
০৩/০৩

মিরপুরে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর মিরপুরে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএমপি। মিরপুর ও পল্লবীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি নজরদারি চলছে।

এক নজরে পুরো খবর
সব সংক্ষেপ
বৃহস্পতিবার৫
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

নামাজের সময়সূচি

ঢাকা ও আশপাশ
পরবর্তী নামাজ—
  • ফজর৪:৪৯ ভোর
  • সূর্যোদয়৬:০৬ সকাল
  • যোহর১১:৪৪ সকাল
  • আসর৩:৪২ বিকাল
  • মাগরিব৫:২০ বিকাল
  • এশা৬:৩৬ সন্ধ্যা

সাহরির শেষ ৪:৪৬ ভোরইফতার ৫:২০ বিকাল

বাংলা ভিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত, ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে দলের রাজনৈতিক কৌশল, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়া এবং দলীয় কাঠামোয় গণতন্ত্রের ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের কথা তুলে ধরে তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত এক দীর্ঘ বিবৃতিতে নিজের পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেন সামান্তা। সেখানে তিনি লেখেন, ‘কিছুক্ষণ আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আমি পদত্যাগ করেছি।’

বিবৃতির শুরুতে সামান্তা জানান, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি দলের প্রচলিত অবস্থানের বাইরে গিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত—কোনো বিবেচনাতেই এনসিপির মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়। দলটির সঙ্গে জোটে যাওয়ার জন্য এনসিপিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি তখন সতর্ক করেছিলেন।

তিনি জানান, গত ১১ মাসে এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। সুযোগ পেলেই আলোচনা, বিতর্ক ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে দলের সিদ্ধান্তগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ভুল পথে পরিচালিত হলে সেই অবস্থান থেকে দলকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা একজন সদস্যের রাজনৈতিক দায়িত্ব। সে কারণেই তিনি দলের স্বীকৃত ফোরামগুলোতে যুক্তির মাধ্যমে মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে গেছেন।

তবে প্রায় এক বছরের সেই প্রচেষ্টার পর তিনি মনে করছেন, এনসিপির পক্ষে প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকা সম্ভব নয়। পদত্যাগের জন্য আরও উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা না করার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, দলের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাঁর পদত্যাগকে মূল্যায়ন করা সহজ হতে পারত। কিন্তু এনসিপি কখনো জামায়াতের সঙ্গে জোট ত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নিলেও পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি তৈরি করতে পারবে বলে তাঁর বিশ্বাস নেই।

সামান্তার ভাষায়, পুরোনো ব্যবস্থার রাজনৈতিক দল দিয়ে রাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; বরং এ ধরনের দল নতুন ব্যবস্থা গঠনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে দলের ভেতরে এত দিন ধরে চলা মতপার্থক্য ও আলোচনার বিষয়গুলো দলের সদস্যদের পাশাপাশি বাইরের শুভানুধ্যায়ীদের কাছেও তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করেছেন তিনি।

জামায়াত কি সংস্কারের রাজনৈতিক মিত্র হতে পারে

সামান্তার বিবৃতির প্রথম বড় আলোচ্য বিষয় ছিল জামায়াতে ইসলামীকে সংস্কারের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য তিনটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন জরুরি ছিল বলে তিনি মনে করেন।

এগুলো হলো—সংবিধানে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের ভিত্তি পরিবর্তনের লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংস্কার, রাষ্ট্র পরিচালনার আইন-কানুন গণবিরোধী অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী করার জন্য আইনি সংস্কার এবং পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার।

তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই তিনটি সংস্কারের কোনোটিকেই নিজেদের দলীয় রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে না। তাঁর মতে, দলটি প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। জামায়াতকে সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে দেখা গেলেও তা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজন থেকে করা হয়।

সামান্তার মতে, গণতান্ত্রিক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয় উদার গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধ থেকে। অন্যদিকে জামায়াত শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধী নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ কারণেই দলটির রাজনীতির মৌলিক ভিত্তিতে পরিবর্তন আসেনি বলে তাঁর দাবি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে জামায়াত গণহত্যাকেও বৈধ মনে করে। ১৯৭১ সালে দলটির ভূমিকার জন্য অপরাধ স্বীকার না করা এবং জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়াকে তিনি সংগঠনটির রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সামান্তার বক্তব্য অনুযায়ী, এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেছে, তখন উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের একটি অংশ সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর মতে, এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না থাকায় দলটি জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহযোগী ভূমিকা নিতে হচ্ছে এনসিপিকে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া দল হিসেবে এই পরিস্থিতি থেকে এনসিপিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা তিনি বারবার করেছেন বলেও জানান।

২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে এনসিপির কৌশলের সমালোচনা

বিবৃতির দ্বিতীয় প্রসঙ্গে সামান্তা ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন না হয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপলক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ ও ১৯৯০ সালের নির্বাচনগুলো কেবল ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সেগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথও তৈরি করেছিল।

কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনকে গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরিয়ে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচনে পরিণত করার চেষ্টা করেছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সামান্তার মতে, ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ব্যর্থ হওয়ার পরও এনসিপির সামনে রাজনৈতিকভাবে পুরোনো ব্যবস্থার মোকাবিলা করতে আগ্রহী শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সুযোগ ছিল। প্রয়োজনে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েও দলটি একটি রাজনৈতিক নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিতে পারত। তাঁর ধারণা, এমন কৌশল গ্রহণ করলে এনসিপি নির্বাচনে বর্তমান ফলাফলের চেয়েও ভালো ফল করতে পারত।

তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক নির্বাচনের ফলাফল কেবল দলীয় ক্ষমতা বা সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাসের আগের রাজনৈতিক নির্বাচনগুলোও সে শিক্ষা দেয়। কিন্তু এনসিপি সেই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের সহযোগী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এর ফলে দলটির নিজস্ব রাজনীতি এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক ধারার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সামান্তা আরও জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও নির্বাচনের বর্তমান ফলাফলের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির পাঁচটি পদ্ধতির কথা তিনি দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু নেতৃত্ব সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিজয়ের পরিবর্তে নির্বাচনী বিজয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে সংস্কারবিহীন ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানোর গ্রহণযোগ্যতাও এনসিপি হারিয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি শহীদ ওসমান হাদির নির্বাচনী প্রচারণার উদাহরণ দেন। সামান্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে ন্যূনতম ৫০০ ভোট পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে ওসমান হাদি সম্পূর্ণ এককভাবে ভিন্ন ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ জামায়াতের সঙ্গে জোট করার মতো পুরোনো ও অগণতান্ত্রিক নির্বাচনী কৌশলের পক্ষে যুক্তি দেখাতে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে ব্যবহার করা হয়েছে। সামান্তা এ যুক্তিকে অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন।

গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক অধিকার

বিবৃতির তৃতীয় অংশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ, তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার এবং এনসিপির সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সামান্তা।

তিনি বলেন, আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন—এমন আন্দোলন পরাজিত হয়নি। বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম নেই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আন্দোলনে নারীরা শুধু অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও আন্দোলনকারীদের রক্ষাকারী।

সামান্তার মতে, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং বৈষম্য-নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান থেকেই নারীরা গণঅভ্যুত্থানে যুক্ত হয়েছিলেন। ব্যারিকেডের সামনে তাঁদের অবস্থান, সাহস ও সক্রিয়তা আন্দোলনকে সর্বজনীন রূপ দিয়েছিল।

কিন্তু আন্দোলনের বিজয়ের পর পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলো নারীদের সেই অর্জিত অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনের সময় যেসব সামাজিক অনুশাসন ও প্রতিবন্ধকতা নারীদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে পারেনি, বিজয়ের পর সেগুলোকেই তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে দুর্বল করে আগের মতো নারীবিহীন রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে।

সামান্তার মতে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। কিন্তু শুধু দলে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। দলের সদস্যসংখ্যা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। তাঁর অভিযোগ, এনসিপি সেই পথ অনুসরণ করেনি; বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়েছে।

তিনি বলেন, এর ফলে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, এনসিপি তা ধারণ করতে পারেনি। পুরোনো দলগুলোর মতোই নারীদের কোণঠাসা করা হয়েছে, তাঁদের প্রতিবাদ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী উল্লেখ করে সামান্তা বলেন, নারীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে শুধু দলের নারী সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া নয়; বরং দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা।

বাংলাদেশের মতো সমাজে নারীদের এগিয়ে নিতে ইতিবাচক বৈষম্য বা পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও অনেক সময় যথেষ্ট হয় না। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো নারীদের পিছিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই ব্যবধান দূর করতে শুধু সমান সুযোগ নয়, নারীদের অধিক প্রতিনিধিত্ব, অধিক ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এত কিছুর পরও প্রতিষ্ঠিত বৈষম্যের পুরো ব্যবধান দূর করা কঠিন হতে পারত বলে মনে করেন তিনি।

নারীদের রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সামান্তা। তাঁর দাবি, এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব শক্তির রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দলের সাংগঠনিক কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও নারীবিরোধী অবস্থান জায়গা করে নিয়েছে।

আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার গুরুত্ব বোঝাতে সামান্তা পুরুষ ও নারীর রক্ষাকারী ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একজন পুরুষ যখন অন্য পুরুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড়ান, তখন তার প্রভাব এক ধরনের হয়। কিন্তু একজন নারী যখন পুরুষের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন, তখন তা প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতাসম্পর্ক ও সামাজিক প্রত্যাশাকে আরও গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে সুরক্ষিত করেছিলেন। অথচ বিজয়ের পর তাঁদের মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি একটি প্রশ্ন সামনে আনেন—আন্দোলনের সময় মিছিলের সামনে নারীদের এগিয়ে রাখা কি তাঁদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি ছিল, নাকি বিপদের মুখে তাঁদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহারের কৌশল ছিল? তাঁর মতে, আন্দোলনের প্রয়োজনে নারীদের সাহস ও ত্যাগ গ্রহণ করা হলেও বিজয়ের পর তাঁদের ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হলে তাঁদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি থাকে না।

সামান্তার বক্তব্য, বৈষম্য, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার বহন করার দাবি করা কোনো দল নিজের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে বৈষম্যমূলক ক্ষমতাসম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। কারণ নারীরা শুধু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেননি, আন্দোলনের চরিত্র নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছেন। যে রাজনৈতিক শক্তি বিজয়ের জন্য নারীদের সাহস ও প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু বিজয়ের পর তাঁদের সমান মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে, তাকে প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী বলা যায় না বলে মনে করেন তিনি।

কাউন্সিল ছাড়াই এনসিপির পুনর্গঠনের সমালোচনা

বিবৃতির চতুর্থ প্রসঙ্গে সামান্তা এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো, কাউন্সিল আয়োজন না করা এবং আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা করেছিল, যার কাঠামো প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আলাদা হবে। এই ভিন্নতা শুধু নেতৃত্ব, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল না। দলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়েও তা প্রকাশ পাওয়ার প্রয়োজন ছিল।

সামান্তা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এসব দলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, পরিবারতন্ত্র, পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব, আর্থিক অস্বচ্ছতা, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা, ভিন্নমত দমন এবং নেতৃত্বের জবাবদিহির অভাব রয়েছে। এসব কারণে সাধারণ কর্মীদের দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। একই সঙ্গে নেতৃত্ব পরিবর্তন ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়।

তাঁর মতে, পুরোনো ধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে কাউন্সিল পিছিয়ে দেওয়া কিংবা আয়োজন না করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সময়মতো কাউন্সিল না হলে নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এতে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অল্প কয়েকজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই কাউন্সিলকে তিনি কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং গণতান্ত্রিক চর্চা ও সাংগঠনিক জবাবদিহির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।

সামান্তার অভিযোগ, কাউন্সিল আয়োজন না করে আবারও আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন বা রিস্ট্রাকচার করার মধ্য দিয়ে এনসিপি দলের ভেতরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে দলটি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই বিরোধী মত দমনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর আরও অভিযোগ, নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার বিষয়ে নেতৃত্বের উদাসীনতা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এনসিপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনআস্থা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।

সামান্তার মতে, যে দল নিজের ভেতরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।

দলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড পুনর্বিবেচনার জন্য বারবার আহ্বান জানানোর পরও এনসিপি অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহী না হওয়ায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অভিমুখও বিবৃতিতে তুলে ধরেন।

বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান

পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যার পর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন সামান্তা। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশকে নানা ধরনের বিভাজনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করা, যা মানুষকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাবে না। বরং ভিন্নমত, বিশ্বাস ও পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সবাইকে একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করবে।

সামান্তার মতে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপির সামনে এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল। দলটিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি তৈরি হবে। কিন্তু সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সেই সম্ভাবনা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তবে কোনো দল বা কয়েকজন নেতার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়া মানেই মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু নয় কিংবা সেই প্রয়োজন শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে এখনো এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন রয়েছে, যার লক্ষ্য হবে মানুষকে বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ করা। এই ঐক্যের ভিত্তি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা একক রাজনৈতিক বিশ্বাস হতে পারে না। বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন অঙ্গীকারই হতে হবে এর মূল ভিত্তি।

এ ধরনের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে নেতৃত্বের চিন্তার কেন্দ্রে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থকে রাখতে হবে বলে মনে করেন সামান্তা। তাঁর মতে, নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও কোনো একটি দেশের প্রতি অন্ধ সমর্থন কিংবা বিরোধিতার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে ফেলা—কোনোটিই স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না।

সামান্তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হতে হবে দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কিংবা বিরাগের ভিত্তিতে নয়। ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হলে যেমন তার বিরোধিতা করতে হবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। এক দেশের ক্ষেত্রে আপসহীন থাকা এবং অন্য দেশের ক্ষেত্রে নীরবতা বজায় রাখাকে তিনি দ্বৈত মানদণ্ড হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির অর্থ হলো বন্ধু কিংবা প্রতিপক্ষ—সব দেশের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।

নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন রাজনৈতিক শক্তির সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন সামান্তা। তাঁর মতে, নারীদের অংশগ্রহণকে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁদের স্বাধীন অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সমান নাগরিক অধিকার রাজনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও জাতীয় পুঁজির বিকাশ ও সুরক্ষা, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং দেশের সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে জনগণের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সামান্তার ভাষ্য, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ শুধু বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা করা নয়। দেশের ভেতরে যেসব ক্ষমতাকাঠামো ও স্বার্থ জনগণের অধিকার এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমিত করে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হবে।

তিনি বলেন, তরুণদের প্রতি মানুষের সমর্থনের পেছনে প্রত্যাশা ছিল—তাঁরা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবেন না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবেন। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের মতো বিষয়গুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশের তরুণদের সামনে নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন সামান্তা। তাঁর মতে, কাজটি শুধু নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এমন একটি ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজন রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে না। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্য যেন তা আড়াল করতে না পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় থাকলেও বাংলাদেশের স্বার্থের ওপরে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকতে পারবে না।

তরুণ সমাজকে আবার সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন উদ্যোগ যেন অতীতের কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরাবৃত্তি না হয়। বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য নতুন প্রচেষ্টা হতে হবে।

বিবৃতির শেষ অংশে সামান্তা লেখেন, ‘আমি এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, কাজ করতে অংগীকারাবদ্ধ যারা আমার সাথে এবিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সকলকে আহবান করছি, যোগাযোগ করুন। আমি আপনাদেরকে সাথে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।’


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ