১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যতের সঠিক পথ নির্ধারণ করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) ‘ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষ্যে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে গৃহীত সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, ‘যারা ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশকে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিষ্ঠুরভাবে হরণ করে দেশে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার কায়েম করতে চেয়েছিল এবং আমাদের শৌর্য, বীর্য, জাতীয় সাহস ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল—১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার সম্মিলিত ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে সেই ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তির চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল।’ তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর ছিল এ জাতির ইতিহাসে দেশপ্রেমিক শক্তি এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী শত্রু-মিত্র সঠিকভাবে চিহ্নিত করার দিন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করে তিনি একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদবাক্য উদ্ধৃত করে বলেন, ‘অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, আর অতীতকে সম্পূর্ণ ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ।’ তাই সার্বক্ষণিক অতীত চর্চায় মগ্ন থাকা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ইতিহাসের শিক্ষা বিস্মৃত হওয়াও একটি জাতির জন্য আত্মঘাতী ঐতিহাসিক ভুল।
তারেক রহমান বলেন, ইতিহাস স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় যে দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় পরাজিত সেই ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী পরবর্তীতে মহাজোটের আবরণে একত্রিত হয়ে দেশকে পুনরায় তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। তারা বিডিআর পিলখানায় সুপরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে জাতীয় প্রতিরক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায় এবং দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদ কায়েম করে। তবে হাজারো শহীদের রক্তের ঋণ এবং ছাত্র-জনতার ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পুনরায় ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের বিপ্লবের মেলবন্ধন টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ছিল দেশের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল সেই অর্জিত স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম।’ তিনি বলেন, ২০২৪ সালে যেভাবে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে রাজপথে নেমে এসেছিল, ঠিক একইভাবে ১৯৭৫ সালেও দেশপ্রেমিক সিপাহি ও মুক্তিকামী জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিল।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো অভ্যন্তরীণ বা বিদেশি দোসররা জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে না পারে কিংবা বাংলাদেশকে কোনো পরশক্তির তাঁবেদারে পরিণত করতে না পারে—সেটিই হোক এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার। আর এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন দল-মত নির্বিশেষে দৃঢ় ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—সবগুলোর মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে একটি স্বনির্ভর, ইনসাফভিত্তিক ও নিরাপদ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
বাণীর সমাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী যেকোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক চক্রান্ত রুখে দিতে দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হওয়া উচিত—‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক প্রেরণা আগামীর একটি আধুনিক ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার মূল চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে।














মন্তব্যসমূহ