মাদক উৎপাদন বন্ধে তালেবানের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আফগানিস্তানে আবারও বাড়ছে আফিমের প্রধান কাঁচামাল পোস্তের চাষ। এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে পোস্ত আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৩৩০ শতাংশ। একই সময়ে আফিম উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) সাম্প্রতিক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আফগানিস্তানে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে পোস্ত চাষ হয়েছিল। ২০২৬ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে ৪৩ হাজার হেক্টরের বেশি হয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আফিম উৎপাদনও। গত বছর দেশটিতে আনুমানিক ৩০০ টন আফিম উৎপাদিত হলেও চলতি বছর তা প্রায় ১ হাজার ৫০০ টনে পৌঁছেছে।
তবে বর্তমান উৎপাদন ও আবাদি জমির পরিমাণ তালেবানের নিষেধাজ্ঞার আগের সময়ের তুলনায় এখনো অনেক কম। নিষেধাজ্ঞার আগে আফগানিস্তানে প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে পোস্ত চাষ হতো। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবৈধ আফিমের উৎস। সে সময় বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা আফিমের প্রায় ৮০ শতাংশ আসত আফগানিস্তান থেকে।
২০২১ সালের আগস্টে দেশটির ক্ষমতা দখল করে তালেবান। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের এপ্রিলে ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে পোস্ত চাষসহ সব ধরনের মাদক উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে গোষ্ঠীটি। এরপরও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আফগানিস্তানে ২২ হাজার হেক্টর জমির পোস্ত ফসল ধ্বংস করার দাবি করেছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা এড়াতে কৃষকেরা চাষাবাদের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছেন বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
অনেক কৃষক এখন বড় জমির পরিবর্তে শস্যখেতের মধ্যে ছোট ছোট জায়গায় পোস্ত চাষ করছেন। কেউ কেউ দেয়ালঘেরা স্থাপনার ভেতরে ফসল উৎপাদন করছেন। আবার শনাক্ত হওয়ার আশঙ্কা কমাতে বীজ বপন ও ফসল কাটার সময়েও পরিবর্তন আনছেন তারা।
ইউএনওডিসির নির্বাহী পরিচালক মনিকা জুমা মনে করেন, আফিমের জন্য পোস্ত চাষ চার গুণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, দরিদ্র কৃষক পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে অবৈধ চাষ বন্ধ রাখার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি, কৃষি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এসব ক্ষেত্রে তালেবান কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন ইউএনওডিসির এই কর্মকর্তা।
আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে চলতি বছর ১৬টিতে পোস্ত চাষের তথ্য পেয়েছে ইউএনওডিসি। সংস্থাটির জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশটির মোট পোস্ত আবাদি জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। ফলে অঞ্চলটি এখন আফগানিস্তানের প্রধান পোস্ত উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
অথচ তালেবানের নিষেধাজ্ঞার আগে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পোস্ত চাষ হতো। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার পর উৎপাদনের ভৌগোলিক কেন্দ্রেও পরিবর্তন এসেছে।
এদিকে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে প্রতি কেজি আফিমের দাম কিছুটা কমেছে। গত বছর প্রতি কেজি আফিমের দাম ছিল ৫৭০ ডলার, যা বর্তমানে কমে ৫০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে তালেবানের নিষেধাজ্ঞার আগের সময়ের তুলনায় এই দাম এখনো অনেক বেশি। তখন প্রতি কেজি আফিমের মূল্য ছিল ১০০ ডলারেরও কম।
ইউএনওডিসির আশঙ্কা, বিভিন্ন অঞ্চলে আফিমের দামের বড় ব্যবধানের কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাদক পাচারের প্রবণতা বাড়তে পারে।
তালেবানের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পর আঞ্চলিক মাদক ব্যবসায়ীরা বাজারে সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আগে থেকে মজুত করা আফিম ব্যবহার করে আসছেন বলে ধারণা করছে ইউএনওডিসি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাদক জব্দের ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, পুরোনো মজুত ক্রমেই কমে আসছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব মাদক প্রতিবেদনেও ইউরোপে হেরোইনের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ উঠে এসেছে। অন্যদিকে, মাদকের চাহিদা অব্যাহত থাকা এবং বাজারে উচ্চমূল্য বজায় থাকায় সরবরাহ কমে গেলে আফগানিস্তানে পোস্ত চাষ আরো সম্প্রসারিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণে সীমান্তপারের অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত ও সেগুলো ভেঙে দিতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মনিকা জুমা। তার মতে, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন।
এ বছর আফগানিস্তানে পোস্ত চাষের এই ব্যাপক বৃদ্ধি সাময়িক কোনো প্রবণতা, নাকি আফিম ও হেরোইন উৎপাদনের নতুন উত্থানের সূচনা—তা এখনই নিশ্চিত নয়। বিষয়টি বুঝতে পরিস্থিতির ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে ইউএনওডিসি।
মন্তব্যসমূহ