পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার ও অপরাধ দমনে আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য বিবেচনা করে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপির বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরতেই বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে।
সংগঠনটি জানায়, পুলিশ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের হামলার মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১ হাজার ৭৬টি হামলার ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন আহত হয়েছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার উদাহরণও তুলে ধরা হয়। গত ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম-খেয়াঘাট এলাকায় একটি মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন। অন্যদিকে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে আনুমানিক ১০টার দিকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানানো হয়।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য, এসব ঘটনায় পুলিশ সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। তবে দায়িত্ব পালনকালে বারবার হামলার শিকার হলে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৯৬ থেকে ১০৬ ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২৭ ও ১২৮ ধারা এবং পুলিশ প্রবিধানেও আইনানুগভাবে বলপ্রয়োগের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক বিধান ও নির্দেশনা রয়েছে।
সংগঠনটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আইজিপির বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশের আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরা। বক্তব্যটিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা কিংবা আইনবহির্ভূতভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়ার বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিষয়ে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা জরুরি। বক্তব্যের বিচ্ছিন্ন অংশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
সংগঠনটি মনে করে, পুলিশ ও গণমাধ্যম উভয়ই জনস্বার্থে কাজ করে। পুলিশ অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর গণমাধ্যম জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। তাই দুই পক্ষের পেশাগত দায়িত্ব ও বাস্তবতা অনুধাবন করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বজায় রাখা জরুরি।
বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি (কার্যকরী কমিটির) কমলকান্ত হাসান ভট্টাচার্য এবং সাধারণ সম্পাদক মারুফুল হক তানভীর।
মন্তব্যসমূহ