ময়মনসিংহের ভালুকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পর নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারকে (৩০) গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগ। ঘটনাটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী উল্লেখ করে তাঁর অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে সংগঠনটি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) মহিলা জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগীয় সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নীলুর সই করা এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান সংগঠনের সেক্রেটারি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দিকা।
বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, একজন নাগরিক সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু সেই সমালোচনার কারণে তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশ করা একজন নাগরিকের অধিকার। নাগরিক তার জনপ্রতিনিধিকে যেমন নির্বাচিত করেন, তেমনি প্রত্যাশা অনুযায়ী জনপ্রতিনিধি ভূমিকা রাখতে না পারলে তার সমালোচনাও করেন। আটক সাথী আক্তারের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীদের দিয়ে মব সৃষ্টি এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়।’
সাথী আক্তারের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে সরকারের রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতের এই নেত্রী।
তাঁর অভিযোগ, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলেও তা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। অথচ সরকারের সমালোচনা করায় একজন নারীকে আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে।
বিবৃতিতে নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, ‘মহিলা জামায়াত মনে করে, এ ঘটনার মাধ্যমে সরকার তার অসহিষ্ণু আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। যেখানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, সেখানে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। বরং আমরা দেখছি, ভিন্নমত প্রকাশ করায় একজন নারীকে রাষ্ট্রের রোষানলের শিকার হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও হতাশাজনক। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী মত দমন করতে চাচ্ছে, যা চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত।’
সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাথী আক্তারকে দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নুরুন্নিসা সিদ্দিকা।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরকার ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভালুকার নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তার।
তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
পরে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় সাথী আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ময়মনসিংহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠায় পুলিশ।
একই দিন বিকেল ৩টার দিকে ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সাজেদুল ইসলাম তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এদিকে সাথী আক্তারের ফেসবুক লাইভের বক্তব্য নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও তথ্য সামনে এসেছে।
ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি সাথী আক্তারের ফেসবুক লাইভের ভিডিও একাধিকবার পর্যালোচনা করেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভিডিওতে সরকারবিরোধী বা সরকারকে নিয়ে আপত্তিকর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ভিডিওটি ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাথী আক্তারের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ওসির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
অন্যদিকে মহিলা জামায়াতের দাবি, মতপ্রকাশের পর একজন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীদের দায়ী করেছে সংগঠনটি। তবে জামায়াতের এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাকর্মীদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সরবরাহ করা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারের গ্রেপ্তার এবং কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এ অবস্থায় তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগ।
মন্তব্যসমূহ