নারী ও শিশুর জীবনমান উন্নয়নে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের সঙ্গে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করতে চায় বাংলাদেশ। বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, কিশোরীদের ক্ষমতায়ন, শিশুসুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ফলাফলভিত্তিক অংশীদারিত্ব জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিস্তারিত জানানো হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশ ও ইউনিসেফের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার বিভিন্ন দিক উঠে আসে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নারী ও শিশুদের উন্নয়ন এবং কল্যাণে ইউনিসেফের অবদানের প্রশংসা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, নারী ও শিশুদের মর্যাদা রক্ষা, সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
এ সময় সরকারের অগ্রাধিকারমূলক ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা খাতে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়।
শামা ওবায়েদ স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকার পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে সরকার এ খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করেছে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাল্যবিবাহের সমস্যা মোকাবিলায় শুধু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জড়িত দারিদ্র্য, প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং মেয়েদের সীমিত সুযোগের মতো আর্থসামাজিক কারণগুলোর সমাধানেও গুরুত্ব দিতে হবে।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীদের বিশেষ ঝুঁকি, অনলাইন হয়রানিসহ নারীর প্রতি সহিংসতা এবং কিশোর অপরাধের বিষয়গুলো উঠে আসে।
অনলাইন হয়রানি মোকাবিলার প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিউইয়র্কে মেটার কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে মেটার একটি স্থানীয় কার্যালয় স্থাপনের বিষয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
একই সঙ্গে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কেও ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালককে অবহিত করেন তিনি।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইউনিসেফের সহযোগিতার প্রশংসা করেন শামা ওবায়েদ।
অন্যদিকে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক সূচকে অর্জিত অগ্রগতির প্রশংসা করেন।
বিশেষ করে শিশুমৃত্যু ও শিশুদের খর্বাকৃতির হার কমানো, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং জন্মনিবন্ধনের আওতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো উল্লেখ করেন তিনি।
নিরাপদ পানীয় জল ও স্যানিটেশন সুবিধা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন ইউনিসেফ প্রধান।
বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ক্যাথরিন রাসেল ভবিষ্যতেও ইউনিসেফের সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
মতবিনিময় সভায় ইউনিসেফের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ, উপপ্রতিনিধি এমানুয়েল আবিরু এবং শিশুসুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহেরিন ক্যাথরিন।
বাংলাদেশের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম এবং মহাপরিচালক কাজী এহসানুল হক।
মন্তব্যসমূহ