রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারায় মনসুর খান প্লাজা মার্কেটে লাগা আগুন প্রায় ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত গোডাউন থেকে মালামাল সরানো এবং পানি দেওয়ার কাজ এখনো চলছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে এক ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ভবনের ভেতরে বিপুল পরিমাণ মালামাল থাকায় সেগুলো সরিয়ে আগুনের অবশিষ্ট তাপ ও ধোঁয়া পুরোপুরি দূর না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজার আগুনের খবর পাওয়া যায়। শুরুতে লালবাগ, সদর দপ্তর সিদ্দিকবাজার ও পলাশী থেকে ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। পরে আগুনের তীব্রতা বিবেচনায় ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানো হয়। রাতভর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।
কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিল চকবাজারের সরু ও যানজটপূর্ণ সড়ক। ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগে। এর সঙ্গে যোগ হয় ভবনের ভেতরের পরিস্থিতি।
ষষ্ঠ তলার একাধিক গোডাউনে শাটার ও তালা লাগানো ছিল। কোনো কোনো গোডাউনে একাধিক তালা থাকায় প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে সেগুলো কেটে ভেতরে ঢুকে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। ভবনের ভেতরে ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না বলে জানান তিনি।
পানির সংকটও আগুন নেভানোর কাজে বাড়তি সমস্যা তৈরি করে। আশপাশের পানির রিজার্ভ শেষ হয়ে গেলে অন্য উৎস থেকে পানি এনে অভিযান চালাতে হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের একাধিক দলে ভাগ করে প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করানো হয়।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভবনের ষষ্ঠ তলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গোডাউন রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গোডাউনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এসব গোডাউনে ছাতা, কসমেটিকস, আতরের বোতল ও আতরসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুত ছিল। বিপুল পরিমাণ দাহ্য ও মজুতকৃত মালামালের কারণে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণে সময় লাগছে।
আগুনে ভবনের ষষ্ঠ তলাটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সপ্তম তলায় তুলনামূলকভাবে সামান্য ক্ষতি হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা। আশপাশের আরও কয়েকটি মার্কেট ও দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও তা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপণের সময় ধোঁয়া ও তীব্র তাপের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্রিফিংয়ে কাজী নজমুজ্জামান চার সদস্য আহত হওয়ার কথা জানান। তাদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে একটি তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে। একই দিনের কয়েকটি প্রতিবেদনে ধোঁয়ায় অসুস্থ ফায়ার সার্ভিস সদস্যের সংখ্যা দুইজন বলা হয়েছে। ফলে আহত সদস্যের সংখ্যা চূড়ান্তভাবে উল্লেখের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুসরণ করাই নিরাপদ।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন নির্বাপণের কাজ শেষ হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে কারণ খতিয়ে দেখা হবে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না হলেও তদন্ত ছাড়া কোনো কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। গোডাউনে থাকা পণ্যের মালিকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের পর ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, চকবাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার এলাকায় অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় সরু রাস্তা, যানজট, ভবনের কাঠামোগত জটিলতা এবং পানির সহজলভ্যতার অভাব বড় সমস্যা তৈরি করে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট স্থানে হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, গোডাউনের মালামালের নিচে জমে থাকা তাপ থেকে ফের আগুন জ্বলে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পুরোপুরি নির্বাপণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মন্তব্যসমূহ