তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহালের পর ভবিষ্যতে কেউ এটি পরিবর্তন করতে চাইলে জনগণের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে বাদ পড়া গণভোটের বিধানও পুনরায় যুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের প্রতিনিধি ও ‘জুলাই যোদ্ধা’দের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আসন্ন সাংবিধানিক সংশোধনীতে এমন কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হবে, যেগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সাংবিধানিক গণভোটের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, ‘যে সংশোধনীটা আমরা সামনে গ্রহণ করব—সে জায়গায় এমন কিছু আর্টিকেলের পরিবর্তন, সংশোধন সংযোজন আসবে; যেগুলো পরিবর্তনে সংশোধনের পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা হচ্ছে সাংবিধানিক গণভোট। আগে যে গণভোট হয়েছে সেটা আইনি গণভোট। এই সাংবিধানিক গণভোটটা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।’
তিনি বলেন, প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদেও সংশোধন আসতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কেন পুনরায় সংবিধানে রাখা হবে, সেই বিষয়ও সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত হবে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যে সংশোধনটা আমরা সামনে আনব—সেখানে প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ মৌলিক বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আসবে। আর্টিকেল ৪৮ ও ৫৬-এ আসবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমরা কেন ধারণ করব, সেই বিষয়গুলো আসবে। আর্টিকেল ১৪২-এ যেখানে গণভোট ছিল না, শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার সেটা উড়িয়ে দিয়েছিল। সেখানে আবার সেটা আমাদের ধারণ করতে হবে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পর সেটি যাতে সহজে পরিবর্তন করা না যায়, সে জন্য ভবিষ্যৎ সংশোধনের ক্ষেত্রেও গণভোটের বিধান রাখার কথা জানান মন্ত্রী।
তার ভাষায়, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় আমরা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করলে সেটা যাতে ভবিষ্যতে কেউ সহজে পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য আমরা ওইটা পরিবর্তন করলেও ভবিষ্যতে জনগণের কাছে যাতে যেতে হয়, সেটায় গণভোটের বিধান রাখতে হবে। সেজন্য এই পরিবর্তনগুলো এবং এই সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো আমরা সংবিধানে নিয়ে আসলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে আমাদের গণভোট দিতে হবে।’
সংবিধানে বর্তমানে গণভোটের বিধান না থাকার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়ার বৈধতা ছিল না। তার দাবি, হাইকোর্ট ওই পরিবর্তনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন এবং আগের বিধানকে সঠিক বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে ‘ডকট্রিন অব ইক্লিপস’-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো অসাংবিধানিক পরিবর্তন আদালত বাতিল করলে আগের সাংবিধানিক বিধান কার্যকর হওয়ার বিষয়টি এই নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সংসদে পুনরায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলা যায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই আসন্ন সাংবিধানিক সংশোধনীতে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা হবে। প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং অন্যান্য মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংবিধানিক গণভোটের বিধান রাখা হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান যুক্ত হয়। পরে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের করা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান বাদ দেওয়া হয়। একই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও বাতিল করা হয়েছিল।
২০২৬ সালের ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মূল অংশগুলো অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখেন। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টি নতুন করে সাংবিধানিক আলোচনায় আসে।
আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সংবিধানের সংশোধিত রূপ বা নতুন একটি টেক্সট প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে। সেখানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ পড়া ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধান পুনঃস্থাপনের বিষয়টি রাখা হবে।
মন্তব্যসমূহ