ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সাম্প্রতিক মতপার্থক্য ও পালটাপালটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং রাজপথের কর্মসূচি নিয়ে দুই দলের দূরত্ব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যেই জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতা’র গুঞ্জন এবং বিএনপি-জামায়াতের পালটাপালটি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে কেন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে, এর পেছনে কী রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে এবং সামনে এর প্রভাব কতটা পড়তে পারে—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বৃহস্পতিবার ফেনীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের অনুসারী এবং একটি ‘গুপ্ত বাহিনী’ জনগণের কল্যাণে সরকারের কর্মসূচিগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে আবারও হাত মিলিয়েছে। তারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘গুপ্ত রাজনীতি’ এবং ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার সরকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এর সঙ্গে জড়িত, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের কোনো কর্মসূচি নেই; বরং তারা কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতেই লিপ্ত।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর দাবি, জামায়াতের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতা’র গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে দল দুটির মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে জামায়াত নেতারা ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক আড়াল করতে গিয়ে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে সখ্যের অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এদিকে নির্বাচনের মাত্র সাত মাস যেতে না যেতেই জামায়াত ও এনসিপির লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও বিএনপির মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সরকারের মেয়াদের এত অল্প সময়ের মধ্যে লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি দেওয়াকে ঘিরে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা চলছে। অনেকের প্রশ্ন, এত কম সময়ের মধ্যে বড় ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তারা আর কী ধরনের কর্মসূচি পালন করবে। একই সঙ্গে অব্যাহত কর্মসূচির কারণে নতুন করে দেশ অচল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, অশুভ আঁতাতকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলকে আরও সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। তার মতে, যুদ্ধের সময়ও যেমন কৌশলগত সংলাপ চলে, সরকারকে ঠিক তেমনই বিরোধী দলের সঙ্গে সংসদীয় রীতিতে সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো দ্বন্দ্বে জড়ালে দেশের সবার ক্ষতি হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে অতীতে যে অন্যায়, অবিচার ও অপকর্ম হয়েছে, সেগুলো অব্যাহত থাকলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি ব্যর্থ হলে জামায়াত বা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তাই সরকার ও বিরোধী দল নিজেদের মধ্যে সংলাপে বসে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তা না হলে পরিণতি অরাজকতা হতে পারে এবং এর মাশুল দিতে হবে বাংলাদেশের জনগণকে। রাজনীতিকদের দূরদর্শিতার অভাব, অপরিপক্বতা ও সীমাবদ্ধতার কারণেই দেশের মানুষ অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দেশে অরাজকতা চায়। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রত্যাশা ছিল, সরকার ও বিরোধী দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতে এ ধরনের বেশ কিছু ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
যদিও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সদ্ভাব বজায় রেখে চলার কথা বলছে বিএনপি, তবে এখন পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে নতুন করে কোনো পারস্পরিক বৈঠক বা আলাপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির একটি বড় অংশের মতে, সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করলেই বর্তমান সরকারের জন্য টেকসই সুফল বয়ে আসবে।
ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী বলেন, একটি কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সমাজে সংসদেই বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা করার কথা। সরকারের বয়স মাত্র ৬-৭ মাস হওয়ার পরই রাজপথে নামার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সব ধরনের বিরোধ ও মতপার্থক্য জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেটি না করে জামায়াত অন্য পথে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘গুপ্ত’ বলতে যাদের বোঝানো হচ্ছে, তারা যদি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শক্তির সঙ্গে ঐক্য করে, তাহলে দুটিই ডুববে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের কখনো মেনে নেবে না। জনগণ দূর ভবিষ্যতেও এ দেশে স্বৈরাচারী শক্তি বা হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান দেখতে চায় না। এ ধরনের অশুভ আঁতাত সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব কিংবা সমঝোতার প্রশ্ন তখনই আসে, যখন তার আসল চরিত্র বোঝা যায়। তার মতে, জামায়াতের আসল চরিত্র বোঝা কঠিন। অতীতে বিভিন্ন সময়ে দলটি আন্দোলনের বন্ধু হয়েও আকস্মিকভাবে অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
আলাল বলেন, ১৯৮৬ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিকে না জানিয়ে জামায়াত হঠাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেয়। ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে হটাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমান্তরালভাবে রাজপথে আন্দোলন করে। আবার ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘদিন বিএনপির পাশে থেকে ২০০১ সালে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়। অথচ এক-এগারোর পর আবার বিএনপির দায় নিতে অস্বীকার করে।
তার ভাষ্য, ঘন ঘন দিক পরিবর্তনকারী দলকে বোঝা কঠিন। এ কারণে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা কিংবা দ্বন্দ্ব—উভয় ক্ষেত্রেই গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। জামায়াত সঠিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন না করে এভাবে দিক পরিবর্তন করতে থাকলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একত্রে আন্দোলন করেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও অনেক জায়গায় জামায়াত ও আওয়ামী লীগ একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও অর্জিত গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জামায়াতের সচেতন থাকা উচিত। জামায়াতে ইসলামী যেন কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে হাত না মেলায়। কারণ ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সমঝোতা করলে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা বিপন্ন হবে এবং ফ্যাসিস্টরাই এতে লাভবান হবে।
অন্যদিকে জামায়াতের সূত্রগুলো বলছে, মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে দলটির মতদ্বৈধতা রয়েছে। এ ছাড়া সরকারকে চাপে ফেলে আরও কিছু দাবি আদায় করতে চায় দলটি। পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতার চিত্র জনমনে তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি করাও দলটির কৌশলের অংশ বলে সূত্রের দাবি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি তাদের ভারতপ্রীতি ও দিল্লিপ্রীতি আড়াল করতে গিয়ে অসত্য কথা বলছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সারা দেশে একদিনে মিছিল করার সুযোগ পায় কীভাবে? প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকায় নিষিদ্ধ দল মিছিল করার দুঃসাহস কীভাবে পায়? তার মতে, মানুষ বিষয়টি বোঝে এবং সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও এ বিষয়ে তথ্য থাকার কথা।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্য ধরে রাখতে চাইলে সরকার কোনো উদ্যোগ নিলে জামায়াত সহযোগিতা করবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সেই অবস্থান রাখবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগকে বিএনপিই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। তারা সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এসব করা হলে তারা সরকারকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু সরকার তা না করে বিরোধী দলের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাজপথের কর্মসূচি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। দুই দলের এই দূরত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হবে—সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
মন্তব্যসমূহ