দেশের পুঁজিবাজারে সংস্কার কার্যক্রম এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করার বিভিন্ন উদ্যোগের প্রভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিদেশিদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের পুরো বছরের প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছে গেছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৭০১ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯৮ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৮৭ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৯ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বেড়েছে ১ হাজার ১৩ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার ৮৯ টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পেছনে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশি পুঁজিবাজারকে ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে এমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করার প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক সূচক প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার, বিদেশি বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং লেনদেন নিষ্পত্তির সময় কমিয়ে আনার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, বিদেশি লেনদেন বাড়ার পেছনে ডিএসইর কোনো একক উদ্যোগকে কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বাজারকে ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে এমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করার প্রস্তুতি, এমএসসিআইসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্ট বা এনআইটিএ-সংক্রান্ত নিয়ম সহজ করা এবং টি+১ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থায় যাওয়ার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা গেছে।
তিনি জানান, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এনআইটিএ ব্যবস্থায় থাকা একটি জটিলতা সম্প্রতি সহজ করা হয়েছে। আগে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পর প্রতিটি লেনদেনের সময় এনআইটিএ হিসাবের মাধ্যমে অর্থের হিসাব সম্পন্ন করতে হতো। ডিএসইর পক্ষ থেকে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক এ প্রক্রিয়া সহজ করেছে।
নতুন ব্যবস্থায় এখন প্রতিটি লেনদেনের সময় আলাদাভাবে হিসাব করার পরিবর্তে বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনের সময় প্রয়োজনীয় হিসাব সম্পন্ন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় প্রশাসনিক জটিলতা কমেছে এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়েছে।
এর পাশাপাশি পুঁজিবাজারে টি+১ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। বাজারে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার।
ডিএসইর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিদেশি লেনদেনে মাসভেদে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে এর প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। জানুয়ারি মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন ছিল ৩৭৭ কোটি ২৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬৬ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬৩ কোটি ২৭ লাখ ৮০ হাজার ৭৯৫ টাকায়।
তবে মার্চে লেনদেন কমে ২৭২ কোটি ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮০ টাকায় নেমে আসে। এপ্রিলেও নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকে এবং ওই মাসে বিদেশি লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭৫ কোটি ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৪৬০ টাকা।
এরপর মে মাসে বিদেশি লেনদেনে বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়। ওই মাসে মোট লেনদেন হয় ৮৩১ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার ৭৭১ টাকা। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের মধ্যে এটিই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ মাসিক লেনদেন।
মে মাসের পর জুনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন হয় ৫৪০ কোটি ১৬ লাখ ৬১ হাজার ৪৭০ টাকা। জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে ৫২৩ কোটি ১৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৬৬ টাকায় দাঁড়ায়। আগস্টে আবারও লেনদেন কমে হয় ৩১৮ কোটি ৫৭ লাখ ২৭ হাজার ৯৯১ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন ছিল ২ হাজার ৬৮৭ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৯ টাকা। ওই বছরের জানুয়ারিতে বিদেশি লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৮১ কোটি ৮১ লাখ ৫ হাজার ১০৫ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ২৬৪ কোটি ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ২৬২ টাকায় পৌঁছালেও মার্চে আবার কমে ১৭১ কোটি ৯৬ লাখ ১৭ হাজার ৭৮৭ টাকায় নেমে আসে।
এপ্রিল ও মে মাসে বিদেশি লেনদেনে আবারও গতি আসে। এপ্রিল মাসে লেনদেন হয় ৪২৬ কোটি ৯৪ লাখ ১ হাজার ২৯৮ টাকা। মে মাসে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৭৪ লাখ ১৯ হাজার ১৪২ টাকা, যা ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে সর্বোচ্চ মাসিক লেনদেন ছিল।
জুনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন কমে ২৮৫ কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৯ টাকায় নেমে আসে। তবে জুলাইয়ে আবার তা বেড়ে ৪৯১ কোটি ৪৩ লাখ ৬৬ হাজার ২১৭ টাকা হয়। আগস্টে বিদেশি লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৭১ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৫৪৮ টাকা।
ডিএসইর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯২০ কোটি ৪২ লাখ ২০ হাজার ২১ টাকা। এর বিপরীতে চলতি বছরের মাত্র প্রথম আট মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০১ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯৮ টাকা। অর্থাৎ বছরের বাকি চার মাস এখনো হিসাবের বাইরে থাকলেও আট মাসেই গত বছরের পুরো বছরের মোট বিদেশি লেনদেনের প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছে গেছে।
সূত্র: বাসস
মন্তব্যসমূহ