ইসরায়েল থেকে গাজায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, কৃত্রিম অঙ্গ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বারবার বিলম্ব জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
শুক্রবার সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে অনুমোদিত ত্রাণ গাজার দক্ষিণ প্রান্তের কেরেম শালোম ক্রসিং দিয়েই প্রবেশ করতে পারছে। অন্যদিকে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে সীমিতসংখ্যক মানুষের চলাচলের সুযোগ রয়েছে। বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন এমন রোগীরাও এই সুযোগের আওতায় রয়েছেন।
ফিলিস্তিনে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি রেইনহিল্ডে ভ্যান দে ভিয়ার্ডট বলেন, “অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বোঝাই একটি ট্রাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী অনেক দেরিতে পৌঁছালে তা জীবন বাঁচাতে পারে না। এটাই মূল বিষয়।”
চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল করতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীকে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে কৃত্রিম অঙ্গ ও সহায়ক সরঞ্জাম প্রবেশের ক্ষেত্রে জটিলতার কথা তুলে ধরেছেন ডব্লিউএইচও প্রতিনিধি। তিনি জানান, গত ছয় মাসে এ ধরনের একটি চালান চারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
ভ্যান দে ভিয়ার্ডট বলেন, “প্রতিবার প্রত্যাখ্যানের অর্থ হলো এমন একজন মানুষের জন্য আরও বিলম্ব, যিনি ইতোমধ্যে একটি অঙ্গ হারিয়েছেন এবং আবার হাঁটার সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।”
তবে ওষুধ প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। ডব্লিউএইচওর হিসাবে, প্রায় ৮৭ শতাংশ ওষুধের চালান অনুমোদন পেয়েছে। প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে ১ শতাংশের কিছু বেশি।
গাজায় মানবিক ও স্বাস্থ্যসামগ্রী বড় পরিসরে, নির্বিঘ্নে এবং পূর্বানুমানযোগ্যভাবে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একই সঙ্গে ত্রাণ সরবরাহের জন্য একাধিক সীমান্তপথ চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
গাজার কিসুফিম, গেট ৯৬, এরেজ ও এরেজ ওয়েস্ট—এই চারটি প্রধান প্রবেশপথ এখনও বন্ধ রয়েছে এবং সেগুলো পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে।
গাজার স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তাদের প্রশংসা করেছেন ভ্যান দে ভিয়ার্ডট। তবে রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম তাদের হাতে নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
শীত শুরু হওয়ায় মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ডব্লিউএইচও প্রতিনিধির হিসাবে, ঠান্ডা ও বন্যার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে প্রায় ২০ লাখ মানুষের নিরাপদ আশ্রয় প্রয়োজন। এতে তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার পাশাপাশি মর্যাদাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের ঘাটতির কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। গাজায় ইঁদুরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কামড়ের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে। জনস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় রোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) বৃহস্পতিবার সতর্ক করেছে, গাজা সিটিতে জমে থাকা কঠিন বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। ভারী যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিন তেল, খুচরা যন্ত্রাংশ ও জ্বালানির অর্থায়নের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকায় স্যানিটেশন পরিস্থিতির উন্নয়নও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির প্রায় ১২ মাস পরও গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত সংকটপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে ওসিএইচএ। এই সময়েও ইসরায়েলি বিমান হামলা ও অন্যান্য সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা
মন্তব্যসমূহ