সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ২২ জুলাই দলটির বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পরদিন বিষয়টি জানিয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দেওয়া হয়। তবে শুধু দল থেকে বহিষ্কারের কারণে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ড শেষে গাজী নজরুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হয়।
গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এতে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে দলীয়ভাবে কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কারের বিষয়টি ৭০ অনুচ্ছেদে সরাসরি উল্লেখ নেই।
এ কারণে শুধু দল থেকে বহিষ্কারের ভিত্তিতে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। তার ভাষ্য, নৈতিক স্খলনের কারণে দল তাকে বহিষ্কার করেছে এবং এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৬ সালের সংসদে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের প্রসঙ্গও টানেন ব্যারিস্টার খোকন। তিনি জানান, ফ্লোর ক্রসিংয়ের কারণে আখতারকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং তিনি আদালতে গিয়েছিলেন। ওই মামলায় তিনি বিএনপির পক্ষে লড়েছিলেন বলেও জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মামলায় আখতার হেরে যান এবং তার সংসদ সদস্য পদ হারাতে হয়েছিল।
অন্যদিকে, গাজী নজরুল ইসলামের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর তাকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। সেখানে তিনি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘পদত্যাগ’-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম ‘বহিষ্কার’ হয়েছেন। জামায়াত নির্বাচন কমিশনকে তার বহিষ্কারের বিষয়টি জানাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে গাজী নজরুল থাকতে পারবেন কি না। নিজের মত হিসেবে তিনি লেখেন, ‘আমার মতে না।’
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা ভোটদান থেকে বিরত থাকলে, কিংবা অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হতে পারে।
তার মতে, ৭০ অনুচ্ছেদে দল কর্তৃক বহিষ্কার বা ‘expulsion’-কে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে—সংবিধানের ভাষা থেকে এমনটি বলা যায় না।
তবে বহিষ্কারের পর কোনো সংসদ সদস্য যদি ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে বলেও তিনি জানান। অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী শুধু বহিষ্কারই সংসদ সদস্যপদ শূন্য করার জন্য যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি নয়। কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সদস্যপদ শূন্য হওয়ার প্রশ্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে এবং প্রয়োজনে তা আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসন হারিয়েছেন কি না, এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশন নিষ্পত্তি করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত—এমন ব্যাখ্যা রয়েছে।
তবে ইসির সিদ্ধান্তকে একেবারে চূড়ান্ত বা ‘অ্যাবসলিউট’ হিসেবে দেখার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দল বা ইসির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন। আবার সিদ্ধান্ত না মানলে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। সেখানেও সমাধান না হলে আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান।
গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছিলেন, শুধু দল থেকে বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে ইসির কিছু করার সুযোগ নেই। স্পিকার বা সংসদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স পাওয়া গেলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে গত ২১ সেপ্টেম্বর ইসি সচিব আখতার আহমেদও জানান, গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে স্পিকারের কাছ থেকে ইসি কোনো চিঠি পায়নি। তার ভাষ্য ছিল, সংসদ সচিবালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই সময় পর্যন্ত গাজী নজরুল ইসলাম সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন।
এর মধ্যে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের লাশ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় দুই দফায় আট দিনের রিমান্ড শেষে সোমবার তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে তার বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
ফলে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, দল থেকে তার বহিষ্কারকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় কীভাবে দেখা হবে এবং স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠাবেন কি না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং স্পিকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রয়োজনে আদালতের সিদ্ধান্তই পরবর্তী অবস্থান নির্ধারণ করবে।
মন্তব্যসমূহ