‘আজকের কাজ আজই শেষ করতে হবে’—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি এমন তাগিদ দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, নাগরিকদের হাতে এখন সময় কম। একই সেবা নিতে বারবার সরকারি দপ্তরে আসার সুযোগ তাদের নেই। তাই দ্রুত, দক্ষ ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব হলো নিজের ওপর অর্পিত কাজ যথাসময়ে শেষ করা। যে দায়িত্ব নিয়ে সরকারি দপ্তরের নির্দিষ্ট পদে বসেছেন, সেই দায়িত্ব মানুষের সেবা নিশ্চিত করার জন্য। দিনের কাজ দিনের মধ্যে শেষ না হলে ওই দিন সেবা প্রত্যাশী মানুষের প্রয়োজনও পূরণ হবে না।
মানুষের সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে জাহিদুল ইসলাম বলেন, একই কাজের জন্য নাগরিকরা এখন বারবার সরকারি অফিসে আসতে চান না। নির্ধারিত সময়ে সেবা না পেলে তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখান। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের ধরন ও মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।
তিনি বলেন, মানুষের কাছে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সময় এখন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একই কাজের জন্য বারবার সময় ব্যয় করার সুযোগ তাদের নেই। তাই সরকারি সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে মানুষের মধ্যে যেন নেতিবাচক ধারণা তৈরি না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। তার মতে, দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে কেউ নেতিবাচক পরিচয় নিয়ে বিদায় নিতে চান না। মানুষের আস্থা অর্জন ও ধরে রাখতে দায়িত্বশীলতা, দক্ষতা এবং সময়মতো সেবা দেওয়ার বিকল্প নেই।
প্রতিদিনের কাজ শেষে আত্মমূল্যায়নের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—দায়িত্ব পালনে তিনি সর্বোচ্চটা দিয়েছেন কি না এবং আরও কিছু করার সুযোগ ছিল কি না। নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এই মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা পেশাই চিরদিন অপরিহার্য থাকবে—এমন ধারণার সুযোগ নেই। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা, চিন্তাভাবনা এবং কাজের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে একটি হোটেলে রোবটের মাধ্যমে কক্ষে সেবা নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি প্রচলিত অনেক কাজের ধরন বদলে দিতে পারে।
জেলা প্রশাসক বলেন, পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের কতটা মানিয়ে নেওয়া যাচ্ছে এবং চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের মূল্যবোধের বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার ভাষ্য, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি সমাজে লোভ, হিংসা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মতো সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। তাই উন্নত সমাজ গঠনে ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশ ও সমাজের প্রতি ব্যক্তিগত অবদানের বিষয়টি নিয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাবার আহ্বান জানান জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রত্যেকের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—সমাজ, দেশ ও পরিবেশের জন্য তিনি কী অবদান রাখছেন এবং মানুষের জন্য কী রেখে যাচ্ছেন।
উন্নত রাষ্ট্র গঠনে নাগরিকদের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। শুধু উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করলেই হবে না, নিজেদের চিন্তা ও মানসিকতার উন্নয়নও ঘটাতে হবে বলে মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক।
সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে তিনি খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের উদাহরণ দেন। এসব কাজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপ বা শাস্তির আশঙ্কায় নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকেই সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, সরকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেয় জনগণ ও রাষ্ট্রের সেবা করার জন্য। তাই সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে। সরকারি বরাদ্দের অর্থ যাতে অপচয় না হয়, সেদিকেও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শারীরিক সুস্থতার ওপরও গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, নিজে সুস্থ না থাকলে সুস্থভাবে চিন্তা করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য যথাযথভাবে কাজ করা কঠিন।
সবশেষে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন এখনো মানুষের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সময়মতো সেবা, দায়িত্বশীলতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে জনগণের সেই আস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
মন্তব্যসমূহ