সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে ন্যাম ভবনের বারান্দায়ও ঘুমাতে হতো বলে আদালতকে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে পুলিশ জানিয়েছে, গাজী নজরুল ইসলাম প্রথমে ধর্মীয় নিয়মে মৌখিকভাবে মরিয়মকে বিয়ে করেছিলেন। পরে নিজ এলাকায় ওই বিয়ের কাবিন রেজিস্ট্রি করা হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে এসব তথ্য তুলে ধরেন।
মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ড শেষে সোমবার গাজী নজরুল ইসলামকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম।
এদিন নজরুল ইসলামকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। প্রসিকিউশনের পক্ষে পুলিশের এসআই রফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দেওয়া আবেদনে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার বাদী মরিয়মের বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহ তার আত্মীয়। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পর্কে তিনি নজরুলের ভাগনে এবং মরিয়ম তার নাতনি সম্পর্কের।
পুলিশের দাবি, গাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় এলে মরিয়মের বাবার বাসায় রাতযাপন করতেন। সেখান থেকেই তিনি সংসদীয় কাজকর্ম পরিচালনা করতেন। এভাবে মরিয়মের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে বলে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে পুলিশ।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ আরও জানায়, গত ১৭ জুন ধর্মীয় নিয়মে মৌখিকভাবে মরিয়মকে বিয়ে করেন গাজী নজরুল ইসলাম। পরে নিজ এলাকায় ওই বিয়ের কাবিন রেজিস্ট্রি করা হয়।
পুলিশ আদালতকে আরও জানায়, গাজী নজরুল ইসলাম তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম এবং মামলার আরেক আসামি তার প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলামকে নিয়ে ন্যাম ভবনে বসবাস করতেন। সেখানে মরিয়মকে মাঝে মাঝে নজরুলের শয়নকক্ষের পাশের বেলকনিতে ঘুমাতে হতো বলে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে উল্লেখ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মামলার ঘটনা সম্পর্কে গাজী নজরুল ইসলামের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে আদালতে দেওয়া আবেদনে এসব তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, প্রথমে থানা পুলিশ নজরুল ইসলামকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পরে ডিবি পুলিশও তাকে রিমান্ডে নেয়। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বা আত্মহত্যায় প্ররোচনার বিষয়ে পুলিশ কোনো প্রমাণ আদালতে দাখিল করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
শুনানি শেষে আদালত গাজী নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই রাতে গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
পরে মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহ।
পরদিন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ওই রাতেই মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এক দিনের রিমান্ড শেষে মাকছুদা ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২৩ সেপ্টেম্বর মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে এর আগে গত ২০ জুলাই ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছিলেন।
পরে গাজী নজরুল ইসলাম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ওই তরুণীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। এরপর সাংগঠনিক তদন্তে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে ২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ইসলামসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পুলিশের বক্তব্য ও আদালতে দেওয়া আবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো তদন্তাধীন অভিযোগ ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে; আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মন্তব্যসমূহ