দেশে হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠায় বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ হাম–রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এর মধ্যে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মূল হাম–রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে যারা টিকা নিতে পারেনি, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুদেরও এ সময় টিকার আওতায় আনা হবে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজধানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে দেশব্যাপী বিশেষ হাম–রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬-এর উদ্বোধন করা হবে। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত উপস্থিত থাকবেন।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্ধারিত বয়সে নিয়মিত টিকার পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের অতিরিক্ত টিকাও শিশুদের দেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবকদের নিজ নিজ সন্তানকে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে টিকা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম বলেন, এবারের কর্মসূচিটি মূলত ‘মপআপ’ কার্যক্রম। অর্থাৎ যারা কোনো কারণে আগের কর্মসূচিতে টিকা নিতে পারেনি, তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ এটি।
এর আগে ইউনিসেফ, গ্যাভি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী হাম–রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ওই কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে হাম টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল হয়েছিল বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের মার্চের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৩। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ১৫ জনের।
সাত মাসের হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮৩ জন এবং নিশ্চিত হাম আক্রান্ত ১০১ জনসহ মোট ১ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আগের দিন পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি হাম রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো টিকাদান। নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকাদান নয়, সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও জরুরি।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের আগের বছরে দেশে হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ছিল না এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২ জন। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আগের অবস্থায় ফিরতে টিকাদানের পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্যসমূহ