সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে জমা পড়া টাকা এখন থেকে প্রতিদিন গণনা করা হবে। দানের মোট অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজের জন্য ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। বাকি ৬৫ শতাংশ অর্থ মাজারের দৈনন্দিন ব্যয় ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই মাস ধরে চলা শাহজালাল মাজারের ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তহীনতার অবসান হলো।
সভা শেষে কমিটির সদস্য সচিব ও সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, এখন থেকে মাজারের দানের টাকা প্রতিদিন গণনা করা হবে। সংগৃহীত অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজের জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখা হবে। ওই ব্যাংক হিসাব সিলেটের জেলা প্রশাসক ও মাজারের মোতোয়াল্লির যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে। অবশিষ্ট ৬৫ শতাংশ অর্থ মাজারের দৈনন্দিন ব্যয় এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় করা হবে।
অর্থ গণনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মাজার কমিটির পক্ষ থেকে একজন ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ম্যানেজার হিসেবে একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন অথবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি একজন হিসাবরক্ষক ও একজন অফিস সহকারী নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মাজার পরিচালনার জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে। জেলা প্রশাসক এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে সিলেট সিটি করপোরেশন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট মহানগর পুলিশ ও সিলেট জেলা পরিষদের একজন করে প্রতিনিধি এবং পুলিশ সুপার সদস্য হিসেবে থাকবেন। মাজারের মোতোয়াল্লি কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া নিয়োগপ্রাপ্ত ম্যানেজার কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। এই কমিটি মাজারের নিরাপত্তা ও উন্নয়নসহ সার্বিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগ এবং তা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদ্দির নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে সময় এক মাসের মধ্যে মাজার পরিচালনার জন্য একটি যৌক্তিক ও সমন্বিত কাঠামোর সুপারিশ দেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে প্রায় আড়াই মাস পর কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
এর আগে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগের পর থেকে মাজারের দানের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হচ্ছিল। গণনার পর অর্থ জেলা প্রশাসনের খোলা ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হচ্ছিল। এ নিয়ে মাজার পরিচালনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মাজারের খাদেমরা।
জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে গত ১৮ জুন বিকেলে মাজারে থাকা পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে মাজারে মানুষের দান করা নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগও সিলগালা করা হয়।
দানবাক্স ও ডেগ সিলগালা করার পর জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগকে ঘিরে সিলেটজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। এক পক্ষের দাবি ছিল, মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে জেলা প্রশাসক কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্য পক্ষ অভিযোগ করে, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার নামে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ছিল একতরফা ও জোরপূর্বক এবং তা মাজারকেন্দ্রিক প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এমন আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। এর পরদিন, তার উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালার চার দিন পর জনসমক্ষে দানবাক্সের তালা খুলে টাকা গণনা করা হয়।
গত ২২ জুন প্রথম দফায় দানবাক্স থেকে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার একটি চেক যুক্ত হলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।
এর ১৮ দিন পর, ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। এ সময় বিভিন্ন দেশের মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণ ও রৌপ্যও পাওয়া যায়। এরপর ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় দানবাক্স ও মানতের ডেগ খোলা হলে ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা পাওয়া যায়। সেদিনও দেশি-বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি সোনা-রূপার অলঙ্কার পাওয়া যায়।
সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর দানবাক্স খুলে ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা পাওয়া যায়। এ সময়ও দেশি-বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি সোনা ও রূপার অলঙ্কার পাওয়া যায়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে দানের অর্থ নিয়মিত গণনা করে নির্ধারিত ৩৫ শতাংশ উন্নয়ন তহবিলে এবং ৬৫ শতাংশ মাজারের দৈনন্দিন পরিচালনা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় করা হবে।