যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসায়িক পরিবেশে একের পর এক চাপ তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে। সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্যের দামের অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মিলিয়ে অনেক ব্যবসায়ী বর্তমান পরিস্থিতিকে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের চেয়েও কঠিন বলে বর্ণনা করছেন।
উত্তর ক্যারোলাইনার র্যালিভিত্তিক ডিলওয়ার্থ কফির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেফ ভজতা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া ব্যবসায়ীদের একজন। কয়েক বছর ধরে কফির বাজারে একাধিক ধাক্কা সামলানোর পর বর্তমানে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার নতুন সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।
২০২৪ সালে ব্রাজিলে কফি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে কফির ফিউচারসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক কফির বাজারে আরও চাপ তৈরি করে। এর সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আবহাওয়ার পরিবর্তন, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং কনটেইনার সংকট যুক্ত হওয়ায় ব্যবসার খরচ আরও বেড়েছে।
ভজতার মতে, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারের এমন অস্থিরতার মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হননি। তিন দশকেরও বেশি সময় আগে জাতীয় পর্যায়ের কফি পরিবেশক প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টের মাসিক জরিপে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন মন্তব্যে সরবরাহব্যবস্থা, মূল্য নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী বর্তমান পরিস্থিতিকে মহামারির সময়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে তখনকার পরিস্থিতিও তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল।
ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা। পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্লাই চেইন কর্মসূচির পরিচালক জ্যাক বাফিংটন বর্তমান পরিস্থিতিকে কোভিড-পরবর্তী সময়ের চেয়ে ভিন্ন ধরনের সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে তৈরি হওয়া চাপের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব এখন অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থিতিশীল পণ্য বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে। এর প্রভাব বিভিন্ন পরিষেবার দামেও পড়ছে, যেখানে একবার মূল্য বাড়ার পর তা আগের পর্যায়ে ফিরতে সময় লাগে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবও জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর পড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ সরবরাহব্যবস্থায় নতুন বাধা তৈরি করছে।
পরপর আঘাত হানা টাইফুনের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার বন্দর সাংহাইয়ের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে বিলম্ব তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বিভিন্ন দেশের ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থায় পড়ছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি, পরিবহন, কাঁচামাল ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাগুলোর সামনে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকির গতিপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র : সিএনএন